বিদ্যালয় আছে, শিক্ষক নেই—টাঙ্গাইলে শূন্য ১,৪৫৯ পদ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১৯:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
শিক্ষক সংকটে টাঙ্গাইলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান। জেলার ১২টি উপজেলায় ১ হাজার ৬২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পড়ে আছে ১ হাজার ৪৫৯টি শিক্ষক পদ। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদই খালি ৮৮৮টি। আর সহকারী শিক্ষকের ৫৭১টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ নানা প্রশাসনিক জটিলতায় তৈরি হওয়া এই সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে কর্মরত শিক্ষকদের। এতে একদিকে যেমন পাঠদানের মান কমছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুত শূন্য পদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে মোট ১ হাজার ৬২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১ হাজার ৬২৩টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৩৫ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৮৮৮টি প্রধান শিক্ষক পদ।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রধান শিক্ষক পদ খালি রয়েছে ঘাটাইলে। সেখানে ১৭২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৬২ জন। অর্থাৎ শূন্য ১১০টি পদ। এছাড়া গোপালপুরে ১২৬, কালিহাতীতে ১১২, নাগরপুরে ১০৫, ভূঞাপুরে ৭৫, মধুপুরে ৭৩, সদর উপজেলায় ৭৪, দেলদুয়ারে ৬৩, মির্জাপুরে ৬০, ধনবাড়ীতে ৩৬, বাসাইলে ৩০ এবং সখীপুরে ২৪টি প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৯ হাজার ৬৮টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৮ হাজার ৪৯৭ জন। ফলে শূন্য রয়েছে আরও ৫৭১টি সহকারী শিক্ষক পদ।
দুই শিক্ষকেই চলছে ১১২ শিক্ষার্থীর পাঠদান
শিক্ষক সংকটের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট ঘাটাইল উপজেলার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী ১১২ জন। পাঁচটি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের দুই শিফটে পাঠদান হয়। পাঁচটি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজ ও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে একজন শিক্ষকের পক্ষে এত শিক্ষার্থীর পাঠদান চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।’
শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিযোগিতাতেও তারা পিছিয়ে পড়ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
একজন শিক্ষককে নিতে হচ্ছে ৩৫-৪০টি ক্লাস
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা শাখার সভাপতি বাশিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক সংকট প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষককে সপ্তাহে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষক সংকট থাকা বিদ্যালয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩৫ থেকে ৪০টি পর্যন্ত হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’
তাঁর মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে বেইজলাইন সার্ভের মতো শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমও ঠিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘শূন্য পদ পূরণে দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন’
টাঙ্গাইলের সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শহীদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই প্রতিটি শিশুকে মানসম্মত শিক্ষায় গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের বাস্তবভিত্তিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
‘সংযুক্তির মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে’
টাঙ্গাইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন মিয়া বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। শূন্যপদগুলোর বড় একটি অংশ প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক সমন্বয় করে সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শূন্য পদ পূরণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মঠ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।’
প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষক সংকট কমাতে এসব এলাকায় শিক্ষকতা বাধ্যতামূলক করার মতো নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের সম্ভাবনার কথাও জানান এই কর্মকর্তা।
শিক্ষক সংকটের এই চিত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে, পাঠদানের চাহিদাও আছে; কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ফলে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ করা না গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে প্রাথমিক শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর।
ছবি: শিক্ষক সংকটে থাকা টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাহাড়ি এলাকার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।






















