ঢাকা ১২:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এক সাংবাদিকের না-বলা কষ্ট নিউইয়র্কে নোয়াখালীর যুবককে গুলি করে হত্যা   পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন ২০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন তারেক রহমান, জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান একই ঘরে চার লাশ, তবু রয়ে গেছে প্রশ্ন—রংপুরের গণপতি পরিবারের হত্যার নেপথ্যে কী? সংবিধান মেনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, অতীতের মতো নির্বাচন হবে না পদোন্নতিতে দক্ষতা ও সততাকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কালিহাতীতে ভয়াবহ আগুন, পুড়ে ছাই ৬ দোকান নিখোঁজের চার দিন পর জঙ্গলে মিলল নারীর অর্ধগলিত মরদেহ রেলস্টেশনে মিলল ৩ কোটি টাকার ভারতীয় অবৈধ পণ্য, জব্দ যৌথ বাহিনীর

একই ঘরে চার লাশ, তবু রয়ে গেছে প্রশ্ন—রংপুরের গণপতি পরিবারের হত্যার নেপথ্যে কী?

রংপুর প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩০:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি। কয়েক দিন আগেও যেখানে ছিল একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর নির্মম মৃত্যুতে শোক আর আতঙ্কে স্তব্ধ এলাকাবাসী।

চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে রংপুর মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের একটি বর্ণনা তুলে ধরেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে ইয়াবা সেবনের পর ওই বাড়ির ছাদে গিয়ে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ঘুমিয়ে থাকা ছেলেকেও হত্যা করা হয়।

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী ছাদে শব্দ শুনে বের হলে গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে সিঁড়িতে আসা স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীও হত্যার শিকার হন। মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে আগামী বেরিয়ে এলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

সবশেষে ঘুমিয়ে থাকা শিশু প্রিয়মকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চারটি প্রাণ এক রাতেই নিভে যাওয়ার পরও যেন হত্যাকারীদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর তারা ওই বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর ও শসা খান এবং আবারও ইয়াবা সেবন করেন।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজেদের পরিচয় ও আলামত আড়াল করতে দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়। বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করতে আগুন জ্বালানো হয়। পরে স্বর্ণালংকার নিয়ে মন্দিরের পেছনের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। পুলিশ সেখান থেকে সেগুলো উদ্ধারের কথা জানিয়েছে।

ঘটনাটিকে ডাকাতির মতো দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্রও এলোমেলো করা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট কিছুটা ফাঁকা থাকার সুযোগে অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

তবে পুলিশের এই বর্ণনা সামনে আসার পরও হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ইয়াবা সেবনের পর অন্যের বাড়ির ছাদে যাওয়ার কারণ কী?

পুলিশ বলছে, অভিযুক্তরা প্রথমে সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় ইয়াবা সেবন করেন। পরে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, নির্মাণাধীন ভবনের খোলা ছাদ থাকা সত্ত্বেও তারা কেন অন্য একটি বাড়ির ছাদে গেলেন? তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?

পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, সংবাদ সম্মেলনে সেটিই জানানো হয়েছে। বাকি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।

ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিকে কেন হত্যা?

সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি উঠছে শিশু প্রিয়মকে নিয়ে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শব্দ শুনে পরিবারের অন্য সদস্যরা একে একে বাইরে এসেছিলেন। কিন্তু প্রিয়ম তখন ঘুমিয়ে ছিল। তাহলে ঘুমন্ত শিশুটিকে কেন হত্যা করা হলো—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

একটি পরিবারের চারজন মানুষকে কেন একসঙ্গে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে শিশুটিকে হত্যার প্রয়োজনই বা কেন মনে হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করেছিল?

ঘটনার পর পুলিশ বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখতে পায়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সংযোগ চালু করে তদন্ত শুরু করেন।

কিন্তু কখন, কীভাবে এবং কারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, সে প্রশ্নের উত্তরও এখনো মেলেনি।

রাত ২টা ৪০ মিনিটের সেই কল

হত্যাকাণ্ডের সময় নির্ধারণ ও ঘটনার গতিপ্রকৃতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আরেকটি বিষয়—রাত ২টা ৪০ মিনিটের একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর দাবি, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুই বোনের মধ্যে প্রায় পাঁচ মিনিট কথা হয়েছিল। পরে রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতা তাকে আবার হোয়াটসঅ্যাপে কল করেন।

কিন্তু ডাটা বন্ধ থাকায় পূজা সেই কল ধরতে পারেননি। পরে তিনি কল ব্যাক করলেও আর যোগাযোগ করতে পারেননি।

প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুর আগে ওই কল কেন করা হয়েছিল? প্রীতিলতা কি কোনো বিপদের কথা জানাতে চেয়েছিলেন? নাকি এটি ছিল নিছকই স্বাভাবিক কোনো কল? তদন্তে এই বিষয়টির উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেন ভয় পেতেন গণপতি?

পরিবারের সদস্যদের কথাতেও উঠে এসেছে কিছু অস্বস্তিকর তথ্য।

স্বজনদের দাবি, অবসরে যাওয়ার প্রায় দুই মাস আগে থেকেই গণপতি চক্রবর্তী হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে তার স্ত্রীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

এ ছাড়া বাড়ি নির্মাণের সময় কয়েকজনের কাছ থেকে গণপতি হুমকি পেয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন স্বজন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। তবে কারা তাকে হুমকি দিয়েছিল, কেন দিয়েছিল—সেটি গণপতি পরিবারের কাউকে জানাননি বলে স্বজনদের ভাষ্য।

তাহলে কি আগে থেকেই কোনো আশঙ্কা করেছিলেন গণপতি? সেই আশঙ্কার সঙ্গে চারজনের হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও এখন তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখার বিষয়।

চারটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই শেষ করেনি, রেখে গেছে একের পর এক প্রশ্ন। পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে হত্যাকাণ্ডের একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরলেও সেই চিত্রের প্রতিটি অংশ এখনো তদন্তে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায়।

কেন ওই বাড়ি? কেন ওই রাত? কেন একে একে চারজন? কেন ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও রেহাই পেল না? আর মৃত্যুর আগে প্রীতিলতার সেই রাত ২টা ৪০ মিনিটের কলের পেছনে কী ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো পরিষ্কার হবে মাছুয়াপাড়ার সেই ভয়াবহ রাতের পুরো রহস্য।

এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এখন অপেক্ষা—তদন্ত কি সত্যিই চারটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই রাতের প্রতিটি অন্ধকার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

একই ঘরে চার লাশ, তবু রয়ে গেছে প্রশ্ন—রংপুরের গণপতি পরিবারের হত্যার নেপথ্যে কী?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩০:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি। কয়েক দিন আগেও যেখানে ছিল একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর নির্মম মৃত্যুতে শোক আর আতঙ্কে স্তব্ধ এলাকাবাসী।

চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে রংপুর মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের একটি বর্ণনা তুলে ধরেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে ইয়াবা সেবনের পর ওই বাড়ির ছাদে গিয়ে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ঘুমিয়ে থাকা ছেলেকেও হত্যা করা হয়।

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী ছাদে শব্দ শুনে বের হলে গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে সিঁড়িতে আসা স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীও হত্যার শিকার হন। মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে আগামী বেরিয়ে এলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

সবশেষে ঘুমিয়ে থাকা শিশু প্রিয়মকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চারটি প্রাণ এক রাতেই নিভে যাওয়ার পরও যেন হত্যাকারীদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর তারা ওই বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর ও শসা খান এবং আবারও ইয়াবা সেবন করেন।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজেদের পরিচয় ও আলামত আড়াল করতে দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়। বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করতে আগুন জ্বালানো হয়। পরে স্বর্ণালংকার নিয়ে মন্দিরের পেছনের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। পুলিশ সেখান থেকে সেগুলো উদ্ধারের কথা জানিয়েছে।

ঘটনাটিকে ডাকাতির মতো দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্রও এলোমেলো করা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট কিছুটা ফাঁকা থাকার সুযোগে অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

তবে পুলিশের এই বর্ণনা সামনে আসার পরও হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ইয়াবা সেবনের পর অন্যের বাড়ির ছাদে যাওয়ার কারণ কী?

পুলিশ বলছে, অভিযুক্তরা প্রথমে সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় ইয়াবা সেবন করেন। পরে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, নির্মাণাধীন ভবনের খোলা ছাদ থাকা সত্ত্বেও তারা কেন অন্য একটি বাড়ির ছাদে গেলেন? তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?

পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, সংবাদ সম্মেলনে সেটিই জানানো হয়েছে। বাকি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।

ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিকে কেন হত্যা?

সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি উঠছে শিশু প্রিয়মকে নিয়ে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শব্দ শুনে পরিবারের অন্য সদস্যরা একে একে বাইরে এসেছিলেন। কিন্তু প্রিয়ম তখন ঘুমিয়ে ছিল। তাহলে ঘুমন্ত শিশুটিকে কেন হত্যা করা হলো—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

একটি পরিবারের চারজন মানুষকে কেন একসঙ্গে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে শিশুটিকে হত্যার প্রয়োজনই বা কেন মনে হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করেছিল?

ঘটনার পর পুলিশ বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখতে পায়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সংযোগ চালু করে তদন্ত শুরু করেন।

কিন্তু কখন, কীভাবে এবং কারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, সে প্রশ্নের উত্তরও এখনো মেলেনি।

রাত ২টা ৪০ মিনিটের সেই কল

হত্যাকাণ্ডের সময় নির্ধারণ ও ঘটনার গতিপ্রকৃতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আরেকটি বিষয়—রাত ২টা ৪০ মিনিটের একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর দাবি, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুই বোনের মধ্যে প্রায় পাঁচ মিনিট কথা হয়েছিল। পরে রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতা তাকে আবার হোয়াটসঅ্যাপে কল করেন।

কিন্তু ডাটা বন্ধ থাকায় পূজা সেই কল ধরতে পারেননি। পরে তিনি কল ব্যাক করলেও আর যোগাযোগ করতে পারেননি।

প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুর আগে ওই কল কেন করা হয়েছিল? প্রীতিলতা কি কোনো বিপদের কথা জানাতে চেয়েছিলেন? নাকি এটি ছিল নিছকই স্বাভাবিক কোনো কল? তদন্তে এই বিষয়টির উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেন ভয় পেতেন গণপতি?

পরিবারের সদস্যদের কথাতেও উঠে এসেছে কিছু অস্বস্তিকর তথ্য।

স্বজনদের দাবি, অবসরে যাওয়ার প্রায় দুই মাস আগে থেকেই গণপতি চক্রবর্তী হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে তার স্ত্রীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

এ ছাড়া বাড়ি নির্মাণের সময় কয়েকজনের কাছ থেকে গণপতি হুমকি পেয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন স্বজন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। তবে কারা তাকে হুমকি দিয়েছিল, কেন দিয়েছিল—সেটি গণপতি পরিবারের কাউকে জানাননি বলে স্বজনদের ভাষ্য।

তাহলে কি আগে থেকেই কোনো আশঙ্কা করেছিলেন গণপতি? সেই আশঙ্কার সঙ্গে চারজনের হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও এখন তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখার বিষয়।

চারটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই শেষ করেনি, রেখে গেছে একের পর এক প্রশ্ন। পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে হত্যাকাণ্ডের একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরলেও সেই চিত্রের প্রতিটি অংশ এখনো তদন্তে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায়।

কেন ওই বাড়ি? কেন ওই রাত? কেন একে একে চারজন? কেন ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও রেহাই পেল না? আর মৃত্যুর আগে প্রীতিলতার সেই রাত ২টা ৪০ মিনিটের কলের পেছনে কী ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো পরিষ্কার হবে মাছুয়াপাড়ার সেই ভয়াবহ রাতের পুরো রহস্য।

এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এখন অপেক্ষা—তদন্ত কি সত্যিই চারটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই রাতের প্রতিটি অন্ধকার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে?