ঢাকা ১২:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এক সাংবাদিকের না-বলা কষ্ট নিউইয়র্কে নোয়াখালীর যুবককে গুলি করে হত্যা   পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন ২০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন তারেক রহমান, জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান একই ঘরে চার লাশ, তবু রয়ে গেছে প্রশ্ন—রংপুরের গণপতি পরিবারের হত্যার নেপথ্যে কী? সংবিধান মেনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, অতীতের মতো নির্বাচন হবে না পদোন্নতিতে দক্ষতা ও সততাকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কালিহাতীতে ভয়াবহ আগুন, পুড়ে ছাই ৬ দোকান নিখোঁজের চার দিন পর জঙ্গলে মিলল নারীর অর্ধগলিত মরদেহ রেলস্টেশনে মিলল ৩ কোটি টাকার ভারতীয় অবৈধ পণ্য, জব্দ যৌথ বাহিনীর

এক সাংবাদিকের না-বলা কষ্ট

সুপন রায়
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৬:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আদালত থেকে জামিনের আদেশ—একজন আসামি ও তাঁর স্বজনদের জন্য দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর যেন খুলে যায় মুক্তির দরজা। জামিনের খবর পৌঁছাতেই স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে স্বস্তি ও আনন্দ। কিন্তু আদালতের আদেশ হাতে আসার পরও অপেক্ষার যেন শেষ হয় না। কখন সেই আদেশ থানায় পৌঁছাবে, কখন বাতিল হবে পরোয়ানা, কখন প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবেন—প্রতিটি মুহূর্ত তখন কাটে উৎকণ্ঠায়।

এই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত স্বজনদের কাছে আবেগঘন। চোখে আনন্দের জল, দীর্ঘ দুশ্চিন্তার অবসানের প্রত্যাশা আর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় মুক্তির উচ্ছ্বাস। জামিন তাই শুধু একটি আইনি আদেশ নয়; স্বজনদের কাছে এটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়ার আশার নাম। আর সেই আশার বাস্তবায়নই হয়ে ওঠে মুক্তির প্রকৃত আনন্দ।

তবে এই কঠিন সময় মানুষকে আরেকবার চিনিয়ে দেয়। সুসময়ে পাশে থাকার মানুষের অভাব হয় না, কিন্তু দুঃসময় এলেই বোঝা যায় প্রকৃত আপনজন কে। বিপদের মুহূর্তে অনেকেই দূরে সরে যান, কেউ ব্যস্ততার অজুহাত দেন, কেউবা নীরবে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেন। অথচ দুঃসময়ে একটি সাহসের কথা, একটি ফোন কিংবা পাশে থাকার ছোট্ট আশ্বাসও ভেঙে পড়া মানুষকে নতুন করে শক্তি দিতে পারে।

এই দুঃসময়ে সাংবাদিক সৌরভ ছিলেন তেমনই একজন। কর্মজীবনের পথচলায় কিছু মানুষ শুধু সহকর্মী হয়ে থাকেন না; হয়ে ওঠেন আস্থার জায়গা, সাহসের উৎস এবং কঠিন সময়ে নির্ভরতার নাম। সৌরভের আন্তরিক সহযোগিতা, পরামর্শ ও পাশে থাকার মানসিকতা মনে রাখার মতো।

কাজের চাপ, সংকট কিংবা অনিশ্চয়তার সময়ে একজন সহকর্মীর সামান্য সহযোগিতাও অনেক বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। সৌরভের কাছ থেকে পাওয়া সেই সহযোগিতা ও আন্তরিকতা তাই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করার মতো। সময় বদলাবে, কর্মক্ষেত্র বদলাবে, পথও হয়তো আলাদা হয়ে যাবে; কিন্তু সহকর্মী হিসেবে পাওয়া ভালোবাসা, সহযোগিতা ও বিশ্বাসের স্মৃতি থেকে যাবে।

সৌরভের প্রতি তাই শুধু ধন্যবাদ নয়—চিরকৃতজ্ঞতা।

জীবনের পথচলায় কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাশে থাকেন, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। তাঁদের সহযোগিতা হয়তো মুহূর্তের, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘদিন। সৌরভ তেমনই একজন—সহকর্মীর পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার একজন মানুষ। স্বার্থহীনভাবে পাশে থাকা মানুষগুলোর ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। চলার পথে পাওয়া সেই সৌরভ তাই স্মৃতিতে থাকবে, কৃতজ্ঞতায় থাকবে।

এই কঠিন সময়ে সাহস জুগিয়েছেন সাংবাদিক শাহ জালাল ও মশিউর রহমানও। দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা আর নানা প্রতিকূলতার মুহূর্তে তাঁদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও আশ্বস্ত করার কথাগুলো মানসিক শক্তির বড় উৎস হয়ে উঠেছে। কখনো একটি সাহসী কথা, কখনো প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো—দেখতে ছোট হলেও এসব সহযোগিতার মূল্য অনেক।

কঠিন সময়ে যারা সাহস জোগান, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা শুধু কথায় প্রকাশ করা যায় না। শাহ জালাল ও মশিউর রহমানের প্রতিও তাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

আর এই পুরো সময়জুড়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন মা ও স্বজনেরা। প্রিয় মানুষটি কখন ফিরবেন—এই অনিশ্চয়তার অপেক্ষা যে কতটা কষ্টের, তা কেবল অপেক্ষায় থাকা মানুষই জানেন। আদালত থেকে জামিনের খবর এলেও আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দুশ্চিন্তা কাটে না। কখন থানায় পৌঁছাবে আদালতের আদেশ, কখন বাতিল হবে পরোয়ানা, কখন প্রিয় মানুষটিকে চোখের সামনে দেখা যাবে—প্রতিটি মুহূর্ত যেন কাটে উৎকণ্ঠায়।

মায়ের চোখে তখন একদিকে সন্তানের জন্য গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে মুক্তির আশার আলো। দীর্ঘ অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠার প্রতিটি মুহূর্ত পেরিয়ে তাঁর একটাই প্রত্যাশা—কখন প্রিয় সন্তানটি ফিরে আসবে, কখন শেষ হবে অপেক্ষার প্রহর, আর বুকের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তা বদলে যাবে স্বস্তি ও আনন্দে।

দুঃসময়ের মুহূর্তে তখন আরও বেশি মনে পড়ে বাবাকে। মনে হয়, বাবা থাকলে হয়তো এই কঠিন সময়ে একা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। তিনি হয়তো সবার আগে পাশে এসে দাঁড়াতেন, মাথায় হাত রেখে বলতেন—‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’

বাবার ছায়া হারানোর পর জীবনের অনেক কঠিন বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কে আপন, কে পর—তা বুঝতে বুঝতে মনে হয়, বাবা থাকলে কখনোই মুখ ফিরিয়ে নিতেন না। বাবা হয়তো আজ পাশে নেই, কিন্তু তাঁর সাহস, ভালোবাসা আর আশ্রয়ের স্মৃতি দুঃসময়ে এখনো সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকে।

আর এই গল্পের কেন্দ্রে থাকা ফেলু দা একজন সাংবাদিক। প্রতিদিন অন্যের গল্প তুলে ধরেন, মানুষের কষ্ট, সংকট আর না-বলা কথাগুলো পৌঁছে দেন পাঠকের কাছে। অথচ নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের গল্পটি হয়তো কাউকে বলা হয়ে ওঠে না।

পেশাগত দায়িত্বের আড়ালে তিনি লুকিয়ে রাখেন অনেক না-বলা অনুভূতি। বাইরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা, হাসিমুখে কাজ করে যাওয়া—সবকিছুর আড়ালেই জমে থাকে একরাশ চাপা কষ্ট। সাংবাদিকতার ব্যস্ততা তাঁকে মানুষের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু নিজের ভেতরের শূন্যতা থেকে দূরে রাখতে পারে না। দুঃসময়ে যখন অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন একাকিত্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

ফেলু দা তাই শুধু একজন সাংবাদিক নন—তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যের কষ্টের কথা লিখতে লিখতে নিজের বুকের কষ্টটুকু নীরবে বয়ে চলেছেন।

সাংবাদিকতা পেশার কারণে নানা সময় নানা চাপ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু মামলায় জড়িয়ে একজন সাংবাদিককে হয়রানির অভিযোগ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। ফেলু দার ক্ষেত্রেও এমন একটি কঠিন সময় নেমে এসেছে বলে অভিযোগ। একদিকে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার চাপ, অন্যদিকে পরিবার ও স্বজনদের দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে তাঁকে।

তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা কিংবা মামলার ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। তাই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া যেন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আইনানুগভাবে সম্পন্ন হয়—এটাই প্রত্যাশা।

অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—একজন মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকা জরুরি। আর একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে সেই অধিকার নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

এই গল্প শুধু একজনের জামিনের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের উৎকণ্ঠা, স্বজনদের অপেক্ষা, প্রয়াত বাবার শূন্যতা, সহকর্মীর নিঃস্বার্থ সহযোগিতা এবং দুঃসময়ে কয়েকজন মানুষের সাহস জোগানোর গল্প। এটি মনে করিয়ে দেয়—দুঃসময় মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার সেই দুঃসময়ই চিনিয়ে দেয় কারা সত্যিকার অর্থে পাশে থাকে।

আর যখন আদালতের আদেশ বাস্তবে মুক্তির দরজা খুলে দেয়, তখন স্বজনদের চোখের জল আর মুখের হাসিতে যে অনুভূতি ফুটে ওঠে—তার নামই মুক্তির উচ্ছ্বাস।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

এক সাংবাদিকের না-বলা কষ্ট

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৬:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

আদালত থেকে জামিনের আদেশ—একজন আসামি ও তাঁর স্বজনদের জন্য দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর যেন খুলে যায় মুক্তির দরজা। জামিনের খবর পৌঁছাতেই স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে স্বস্তি ও আনন্দ। কিন্তু আদালতের আদেশ হাতে আসার পরও অপেক্ষার যেন শেষ হয় না। কখন সেই আদেশ থানায় পৌঁছাবে, কখন বাতিল হবে পরোয়ানা, কখন প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবেন—প্রতিটি মুহূর্ত তখন কাটে উৎকণ্ঠায়।

এই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত স্বজনদের কাছে আবেগঘন। চোখে আনন্দের জল, দীর্ঘ দুশ্চিন্তার অবসানের প্রত্যাশা আর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় মুক্তির উচ্ছ্বাস। জামিন তাই শুধু একটি আইনি আদেশ নয়; স্বজনদের কাছে এটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়ার আশার নাম। আর সেই আশার বাস্তবায়নই হয়ে ওঠে মুক্তির প্রকৃত আনন্দ।

তবে এই কঠিন সময় মানুষকে আরেকবার চিনিয়ে দেয়। সুসময়ে পাশে থাকার মানুষের অভাব হয় না, কিন্তু দুঃসময় এলেই বোঝা যায় প্রকৃত আপনজন কে। বিপদের মুহূর্তে অনেকেই দূরে সরে যান, কেউ ব্যস্ততার অজুহাত দেন, কেউবা নীরবে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেন। অথচ দুঃসময়ে একটি সাহসের কথা, একটি ফোন কিংবা পাশে থাকার ছোট্ট আশ্বাসও ভেঙে পড়া মানুষকে নতুন করে শক্তি দিতে পারে।

এই দুঃসময়ে সাংবাদিক সৌরভ ছিলেন তেমনই একজন। কর্মজীবনের পথচলায় কিছু মানুষ শুধু সহকর্মী হয়ে থাকেন না; হয়ে ওঠেন আস্থার জায়গা, সাহসের উৎস এবং কঠিন সময়ে নির্ভরতার নাম। সৌরভের আন্তরিক সহযোগিতা, পরামর্শ ও পাশে থাকার মানসিকতা মনে রাখার মতো।

কাজের চাপ, সংকট কিংবা অনিশ্চয়তার সময়ে একজন সহকর্মীর সামান্য সহযোগিতাও অনেক বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। সৌরভের কাছ থেকে পাওয়া সেই সহযোগিতা ও আন্তরিকতা তাই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করার মতো। সময় বদলাবে, কর্মক্ষেত্র বদলাবে, পথও হয়তো আলাদা হয়ে যাবে; কিন্তু সহকর্মী হিসেবে পাওয়া ভালোবাসা, সহযোগিতা ও বিশ্বাসের স্মৃতি থেকে যাবে।

সৌরভের প্রতি তাই শুধু ধন্যবাদ নয়—চিরকৃতজ্ঞতা।

জীবনের পথচলায় কিছু মানুষ নিঃশব্দে পাশে থাকেন, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। তাঁদের সহযোগিতা হয়তো মুহূর্তের, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘদিন। সৌরভ তেমনই একজন—সহকর্মীর পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার একজন মানুষ। স্বার্থহীনভাবে পাশে থাকা মানুষগুলোর ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। চলার পথে পাওয়া সেই সৌরভ তাই স্মৃতিতে থাকবে, কৃতজ্ঞতায় থাকবে।

এই কঠিন সময়ে সাহস জুগিয়েছেন সাংবাদিক শাহ জালাল ও মশিউর রহমানও। দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা আর নানা প্রতিকূলতার মুহূর্তে তাঁদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও আশ্বস্ত করার কথাগুলো মানসিক শক্তির বড় উৎস হয়ে উঠেছে। কখনো একটি সাহসী কথা, কখনো প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো—দেখতে ছোট হলেও এসব সহযোগিতার মূল্য অনেক।

কঠিন সময়ে যারা সাহস জোগান, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা শুধু কথায় প্রকাশ করা যায় না। শাহ জালাল ও মশিউর রহমানের প্রতিও তাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

আর এই পুরো সময়জুড়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন মা ও স্বজনেরা। প্রিয় মানুষটি কখন ফিরবেন—এই অনিশ্চয়তার অপেক্ষা যে কতটা কষ্টের, তা কেবল অপেক্ষায় থাকা মানুষই জানেন। আদালত থেকে জামিনের খবর এলেও আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দুশ্চিন্তা কাটে না। কখন থানায় পৌঁছাবে আদালতের আদেশ, কখন বাতিল হবে পরোয়ানা, কখন প্রিয় মানুষটিকে চোখের সামনে দেখা যাবে—প্রতিটি মুহূর্ত যেন কাটে উৎকণ্ঠায়।

মায়ের চোখে তখন একদিকে সন্তানের জন্য গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে মুক্তির আশার আলো। দীর্ঘ অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠার প্রতিটি মুহূর্ত পেরিয়ে তাঁর একটাই প্রত্যাশা—কখন প্রিয় সন্তানটি ফিরে আসবে, কখন শেষ হবে অপেক্ষার প্রহর, আর বুকের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তা বদলে যাবে স্বস্তি ও আনন্দে।

দুঃসময়ের মুহূর্তে তখন আরও বেশি মনে পড়ে বাবাকে। মনে হয়, বাবা থাকলে হয়তো এই কঠিন সময়ে একা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। তিনি হয়তো সবার আগে পাশে এসে দাঁড়াতেন, মাথায় হাত রেখে বলতেন—‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’

বাবার ছায়া হারানোর পর জীবনের অনেক কঠিন বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কে আপন, কে পর—তা বুঝতে বুঝতে মনে হয়, বাবা থাকলে কখনোই মুখ ফিরিয়ে নিতেন না। বাবা হয়তো আজ পাশে নেই, কিন্তু তাঁর সাহস, ভালোবাসা আর আশ্রয়ের স্মৃতি দুঃসময়ে এখনো সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকে।

আর এই গল্পের কেন্দ্রে থাকা ফেলু দা একজন সাংবাদিক। প্রতিদিন অন্যের গল্প তুলে ধরেন, মানুষের কষ্ট, সংকট আর না-বলা কথাগুলো পৌঁছে দেন পাঠকের কাছে। অথচ নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের গল্পটি হয়তো কাউকে বলা হয়ে ওঠে না।

পেশাগত দায়িত্বের আড়ালে তিনি লুকিয়ে রাখেন অনেক না-বলা অনুভূতি। বাইরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা, হাসিমুখে কাজ করে যাওয়া—সবকিছুর আড়ালেই জমে থাকে একরাশ চাপা কষ্ট। সাংবাদিকতার ব্যস্ততা তাঁকে মানুষের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু নিজের ভেতরের শূন্যতা থেকে দূরে রাখতে পারে না। দুঃসময়ে যখন অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন একাকিত্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

ফেলু দা তাই শুধু একজন সাংবাদিক নন—তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যের কষ্টের কথা লিখতে লিখতে নিজের বুকের কষ্টটুকু নীরবে বয়ে চলেছেন।

সাংবাদিকতা পেশার কারণে নানা সময় নানা চাপ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু মামলায় জড়িয়ে একজন সাংবাদিককে হয়রানির অভিযোগ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। ফেলু দার ক্ষেত্রেও এমন একটি কঠিন সময় নেমে এসেছে বলে অভিযোগ। একদিকে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার চাপ, অন্যদিকে পরিবার ও স্বজনদের দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে তাঁকে।

তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা কিংবা মামলার ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। তাই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া যেন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আইনানুগভাবে সম্পন্ন হয়—এটাই প্রত্যাশা।

অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—একজন মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকা জরুরি। আর একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে সেই অধিকার নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

এই গল্প শুধু একজনের জামিনের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের উৎকণ্ঠা, স্বজনদের অপেক্ষা, প্রয়াত বাবার শূন্যতা, সহকর্মীর নিঃস্বার্থ সহযোগিতা এবং দুঃসময়ে কয়েকজন মানুষের সাহস জোগানোর গল্প। এটি মনে করিয়ে দেয়—দুঃসময় মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার সেই দুঃসময়ই চিনিয়ে দেয় কারা সত্যিকার অর্থে পাশে থাকে।

আর যখন আদালতের আদেশ বাস্তবে মুক্তির দরজা খুলে দেয়, তখন স্বজনদের চোখের জল আর মুখের হাসিতে যে অনুভূতি ফুটে ওঠে—তার নামই মুক্তির উচ্ছ্বাস।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট