হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই উধাও ট্রান্সরেল ও অমৃক সিং?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৪৭:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ। অথচ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই উধাও ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড ও প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিং।
বিপুল অর্থের এই প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি, অসম্পূর্ণ অংশ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা অনেকটা গা-ঢাকা দিয়েছেন।
আরও পড়ুন :ট্রান্সরেইল লাইটিং ও অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, দুদকে নালিশ
প্রশ্ন উঠছে—হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কাজ অসম্পূর্ণ থাকার দায় কার? প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ হবে কীভাবে? আর ইতোমধ্যে দেওয়া অর্থের হিসাবই বা কতটা স্বচ্ছ?
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB)-এর নথি অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার বিভিন্ন কাজে ট্রান্সরেলসহ একাধিক ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ঠিকাদার হিসেবে যুক্ত।
এর মধ্যে ট্রান্সরেলের নদী পারাপারের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পদ্মা ও যমুনা নদী পারাপারের লাইনের কাজ থমকে গিয়েছিল এবং প্রকল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির বিদেশি কর্মীদের অনুপস্থিতি কাজের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে ট্রান্সরেলের নদী পারাপারের কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ৫২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন :শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, ট্রান্সরেলকে ঘিরে তোলপাড়
তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। PGCB-এর ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনে ট্রান্সরেলকে একটি পৃথক প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার মোট ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ওই প্রকল্পে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি ছিল ৬৩.৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৪৮.৯১ শতাংশ; সমাপ্তির সময় নির্ধারিত ছিল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—এত বড় অঙ্কের প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি যেখানে এখনো অসম্পূর্ণ, সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কোথায় এবং বাকি কাজের দায়িত্বই বা কে নেবে?
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB)-এর কর্মকর্তাদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নদী পারাপারের সঞ্চালন লাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের দায়িত্বে রয়েছে পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর দিয়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের একটি বড় অংশ।
তাদের ভাষ্য, অতীতে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীরা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছিল। ফলে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
PGCB কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, জনবল, সরঞ্জাম এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অগ্রগতি নিবিড়ভাবে তদারক করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নদী পারাপারের অংশটি সম্পন্ন না হলে রূপপুর কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন : Transrail Under Fire Over Alleged Corruption Worth Hundreds of Crores
বিশ্লেষকদের মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার মতো বড় প্রকল্পে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের প্রকল্পে অর্থ ছাড়, কাজের অগ্রগতি, চুক্তির শর্ত এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা—সবকিছুই স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, শুধু প্রকল্পের কাজ কতটা এগিয়েছে তা দেখলেই হবে না; ইতোমধ্যে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, তার বিপরীতে কতটুকু কাজ হয়েছে এবং অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ থাকলে এর প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়মতো বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা চালু না হলে পুরো রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
কোথায় অমৃক সিং?
দুদকে অভিযোগ দায়েরের পর ট্রান্সরেলের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন বলে অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো স্পষ্ট নয়।
অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই অমৃক সিংয়ের বর্তমান অবস্থান এবং তিনি কীভাবে দেশ ছেড়েছেন, সে বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।























