ক্ষতিপূরণ না দিয়েই সঞ্চালন লাইনের কাজ
শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, ট্রান্সরেলকে ঘিরে তোলপাড়

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৩৭:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নির্মাণাধীন সঞ্চালন লাইন প্রকল্পে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের নির্মাণকাজ, অর্থব্যবস্থাপনা, ভূমি ও গাছের ক্ষতিপূরণ এবং কর পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে। এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রকল্পে মোট কত টাকা বরাদ্দ ছিল, কত টাকা ছাড় হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কত টাকা বিতরণ করা হয়েছে?
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, কেইসি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড (টিটিএল) ও লারসেন অ্যান্ড টুব্রো লিমিটেড (এল অ্যান্ড টি) এই তিনটি প্রতষ্ঠান কাজ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশজুড়ে ১৭টি সঞ্চালন প্রকল্পে দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় কোম্পানিগুলো। দায়িত্বপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে- এলঅ্যান্ডটি, ট্রান্সরেল ও কেইসি।
আরও পড়ুন : ট্রান্সরেইল লাইটিং ও অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, দুদকে নালিশ
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের কর্মকর্তা বলেন, ভারতীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড (টিটিএল) কাজের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে। তারা বাংলাদেশের শত শত কোটি টাকা ভারতে পাচার করেছে।
সরকারি সূত্র জানায়, ৪৬৪ কিলোমিটারের ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পটি সহজে ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চারটি প্যাকেজে বিভক্ত করা হয়েছে।
এগুলো হলো- ১০২ কিলোমিটার রূপপুর-বগুড়া লাইন, ১৪৪ কিলোমিটার রূপপুর-গোপালগঞ্জ লাইন, ১৪৭ কিলোমিটার রূপপুর-ঢাকা লাইন এবং ৫১ কিলোমিটার আমিনবাজার-কালিয়াকৈর লাইন।
নদী পারাপারের ১৩ কিলোমিটার কাজটিও কয়েকটি প্যাকেজ নিয়ে গঠিত- ছয় কিলোমিটার পদ্মা নদী পারাপার লাইন এবং সাত কিলোমিটার যমুনা নদী পারাপার লাইন।
একইভাবে ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পটি তিনটি প্যাকেজে বিভক্ত- ৬০ কিলোমিটার রূপপুর-বাঘাবাড়ী লাইন, ১৪৫ কিলোমিটার রূপপুর-ধামরাই লাইন এবং সাত কিলোমিটার যমুনা নদী পারাপার লাইন।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের ওপরই সময়মতো আরএনপিপি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি নির্ভর করবে উল্লেখ করে পিজিসিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অবকাঠামো প্রস্তুত না হলে, রূপপুর কেন্দ্র সময়মতো সম্পন্ন হওয়ার পরেও এর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে না।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারতীয় ঠিকাদার কর্মীরা আকস্মিক চলে যাওয়ায় এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় অন্যতম শীর্ষ ঠিকাদার লারসেন অ্যান্ড টুব্রোকে পাবনার রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ স্থানান্তরের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রধান প্রধান চুক্তিগুলো দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপনের দায়িত্ব পেয়েছে যেগুলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের গ্রিড সিংঙ্ক্রোনাইজেশন এবং টেস্টিং প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর কাজ ২০২৫ সালের প্রথম দিকে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্রায় ৮২ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য জমি ও গাছ কাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রতি কিলোমিটারে গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় তিন লাখ টাকা করে বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও অনেক জমি ও গাছের মালিক সেই অর্থ পাননি। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও কাজ শেষ হওয়ার পরও তাঁদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
অভিযোগপত্রে ফুলচান, মো. নবী, সুমা আক্তার, আদুরীসহ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাঁদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ বঞ্চিত করার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, এভাবে শত শত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—প্রকল্পের অনুমোদিত ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট কত টাকা বরাদ্দ ছিল, কত টাকা ছাড় হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কতজনকে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই করলেই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
অভিযোগে জমি অধিগ্রহণ বা ব্যবহার বাবদ যথাযথ অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের জন্য তাঁদের জমি ব্যবহার করা হলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর প্রকাশিত নথিতে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডকে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রকল্পের পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায়ও ট্রান্সরেলকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদার হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পিজিসিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডকে সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করে প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির তথ্যও দেওয়া হয়েছে। নথিতে প্রকল্পটির নির্ধারিত সমাপ্তির সময় সেপ্টেম্বর ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালে পিজিসিবি ও ট্রান্সরেল লাইটিং-সংক্রান্ত একটি যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে যমুনা নদীর ওপর প্রায় ৯ কিলোমিটার রিভার-ক্রসিং সঞ্চালন লাইন নির্মাণের চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের কারিগরি মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু এলাকায় টাওয়ারের জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতার তুলনায় কম গভীরতায় পাইলিং করা হয়েছে। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম সিমেন্ট ও নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগও তাঁরা করেছেন।
এই ঘটনায় অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ক্ষতিপূরণের অর্থের হিসাব।
প্রকল্পের নথিতে টাঙ্গাইল অংশে জমি ও গাছের ক্ষতিপূরণের জন্য কত টাকা বরাদ্দ ছিল, সেই অর্থ কোন সংস্থার মাধ্যমে ছাড় হয়েছে, কার নামে তালিকা তৈরি হয়েছে এবং কতজন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অর্থ পেয়েছেন—এসব তথ্য একত্র করা প্রয়োজন।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে একদিকে বিপুল সরকারি ও বৈদেশিক অর্থ জড়িত, অন্যদিকে রূপপুরের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টি সরাসরি এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অভিযোগগুলো শুধু দুর্নীতির প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; নির্মাণকাজের মান, প্রকল্পের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও কমিশনের মাধ্যমে ট্রান্সরেইল প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ বেশ আলোচিত। রূপপুর প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড ও প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিং জড়িত। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তাই বর্তমান সরকারের উচিত এই প্রকল্প নিয়ে আরও অধিকতর অনুসন্ধান করা। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি মানে দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া।



















