বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা,দাবি ৩০ হাজার

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:০৩:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ঘোষিত এই মজুরি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর প্রায় তিন বছর পার হতে চলেছে। এর মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শ্রমিকের মজুরি সমন্বয় হয়নি। ফলে মাসের আয় দিয়ে সংসারের মৌলিক চাহিদা মেটানো কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্ন সামনে রেখেই ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা।
রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের মুখে রোববার (১ নভেম্বর) সরকার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে নতুন বোর্ড গঠনই সংকটের সমাধান নয়। প্রশ্ন হলো, শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এবার মজুরি নির্ধারণ করা হবে, নাকি আগের মতোই মালিকপক্ষের উৎপাদন ব্যয় ও সক্ষমতার হিসাব প্রাধান্য পাবে?
সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মজুরিতে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। অন্যদিকে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে বোর্ডের সুপারিশ এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
মজুরি বাড়ার ইতিহাস: চার দশকে ২০ গুণ, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা কতটা?
মজুরি বৃদ্ধির ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ছিল ৬২৭ টাকা। ১৯৯৪ সালে তা বেড়ে ৯৩০ টাকা, ২০০৬ সালে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১০ সালে ৩ হাজার, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ এবং ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকা হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে তা বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। চার দশকে নামমাত্র মজুরি প্রায় ২০ গুণ হলেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিয়ে শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বেড়েছে, সেই হিসাবই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের মজুরি কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে শুধু সর্বনিম্ন অঙ্ক নয়, গ্রেডভেদে মজুরির ব্যবধান, মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতার কাঠামোও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ, কাগজে মোট মজুরি বাড়লেও শ্রমিকের হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা থাকে, তা নির্ভর করে বেতন কাঠামোর বিভিন্ন উপাদানের ওপর।
বোর্ডে মালিক-শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব, নিরপেক্ষতা কতটা নিশ্চিত হবে?
নতুন ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদকে নিরপেক্ষ সদস্য করা হয়েছে।
বোর্ডে উভয় পক্ষের প্রতিনিধি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্রমিকের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রমিকদের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত তথ্য, বাসাভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা, পরিবহন ও পরিবারের সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা হবে কি না, সেটিই হবে বোর্ডের কাজের বড় পরীক্ষা।
একই সঙ্গে মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেওয়া পণ্যমূল্য, কারখানার মুনাফা এবং শ্রমিকের মজুরির অনুপাত—এসব তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনার সুযোগ থাকা দরকার। শুধু মালিকদের ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি কিংবা শ্রমিকদের দাবির অঙ্ক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায় কোথায়?
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বড় অংশের পণ্য যায় আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে শ্রমিকের মজুরি নিয়ে আলোচনায় শুধু সরকার, মালিক ও শ্রমিকের ভূমিকা নয়, বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণের নীতিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ক্রেতারা যদি পণ্যের দাম বাড়াতে রাজি না হন, তাহলে সেই চাপ কার ওপর পড়বে—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য পণ্যমূল্য আদায়ের দাবি উঠে এসেছে। অন্যদিকে, কারখানামালিকেরা উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরছেন। ফলে মজুরি বাড়ানোর দায়িত্ব কেবল কারখানার ওপর চাপিয়ে দেওয়া, কিংবা ক্রেতাদের দায় উপেক্ষা করা—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
মজুরি বোর্ড গঠনই কি আন্দোলনের সমাধান?
শ্রমমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রধান দাবির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো—কবে নতুন মজুরি ঘোষণা হবে, কত টাকা নির্ধারণ করা হবে এবং তা কবে থেকে কার্যকর হবে।
আইন অনুযায়ী, বোর্ড সুপারিশ করবে এবং সরকার তা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করবে। ফলে বোর্ডের সুপারিশ, সরকারের সিদ্ধান্ত ও গেজেট প্রকাশ—প্রতিটি ধাপেই সময়ক্ষেপণের ঝুঁকি রয়েছে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: নতুন মজুরি ঘোষণা করলেই কি শ্রমিকের জীবনমানের উন্নতি নিশ্চিত হবে? মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা, নির্ধারিত সময়ে বেতন পরিশোধ, অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নতুন মজুরির সুফলও সীমিত থাকতে পারে।
পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এ খাতের স্থিতিশীলতা যেমন জরুরি, তেমনি যাঁদের শ্রমে এই শিল্প সচল থাকে, তাঁদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও শিল্পমালিকদের দায়িত্ব। নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু একটি অঙ্ক নির্ধারণ নয়; বরং শ্রমিকের ন্যায্য আয়, শিল্পের টেকসই সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।






















