রাজা আইনের উর্ধ্বে নয়
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৫১:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
প্রতিটি স্বাধীন, সভ্য, আধুনিক দেশের ন্যায় আইনের শাসন সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশের সংবিধানের এই অন্যতম নীতি আইনের শাসন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ সকল দেশের সংবিধানে গৃহিত ও বহুল প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন মূলত আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল। আইন প্রণীত হয় জনগনের কল্যাণের জন্য ও সমাজে ভারসাম্য আনয়নের জন্য। এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের মাধ্যমে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আইনের শাসনের প্রধান উদ্দেশ্যে হলো সমাজে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানুষের কল্যানের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সমাজ বিনির্মানে নিশ্চিত করা ও নিরাপদ ভূমিকা।
এ প্রসঙ্গে আইনের শাসন ধারনার অন্যতম প্রর্বতক ডাইসি বলেছেন যে আইনের শাসনে সমতা থাকা উচিত এবং কোনো ভেদাভেদ না করে সকলকে একই আইন ও আদালতের অধীনে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩১ অনুচ্ছেদে সমতার নীতির এক অসাধারণ বর্ননা আছে যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সংবিধানের তুলনায় অনেক অগ্রগামী। এটি অভিসংবাদিত যে আইনের শাসন গণতন্ত্রের অন্যতম উৎস ও অনিবার্য পূর্বশর্ত কিন্তু এই আইনের শাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই আইনের শাসন ও সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবে খুবই অপরিহার্য।
উপযুক্ত বিচারকের যোগ্যতা সর্ম্পকে কোন কোন আইন বিশেষজ্ঞ লেখকের অভিমত এই যে, “সকল বিচারকের আইন সম্পর্কিত ধারনা একরকম না থাকতে পারে। যদি কোনো বিচারক মনোজগতে এটি ধারনা করেন যে তার ধারনাটিই চূড়ান্ত তাহলে তার পক্ষে আইনজীবীদের উত্থাপিত যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে বিচারকের সিদ্ধান্ত অজান্তেই বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই সঠিক ও দৃড় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং উদার ও ধৈর্যশীল মন নিয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শ্রবণ করাটা একজন বিচারকের সঠিক এবং প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে এর মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়টি। সেই সাথে আস্থা বাড়ে বিচারপ্রার্থী মানুষের।”
এই প্রসঙ্গে বোম্বে হাইকোর্ট এর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি চাগলার কথা উল্লেখ করে তাহার কথা এইভাবে বলা হয় যে “তার আইন বিষয়ে জ্ঞান ছিলো অপরিসীম, বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন প্রখর। সাধারণ জ্ঞান বা কমন সেন্স ছিলো তার। অতুলনীয়। আদালত কক্ষের ভিতরে বা বাইরে সর্বত্রই তার জ্ঞানের পরিচয় পরিলক্ষিত হতো বলে শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই হলো একজন বিচারকের শক্তি। আর এই শক্তিই বিচারক ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করে।
৬৯ ডিএলআর (এইচসি) ৩১৭ পৃষ্ঠায় একটি উল্লেখযোগ্য রায় প্রকাশিত হয়েছে। ঐখানে ৭টি মানদন্ডের এর কথা উল্লেখ করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল বিচারকের বয়স ৪৫ বৎসর হতে হবে এবং আপীল বিভাগে সনদ প্রাপ্তরা অগ্রাধিকার পাবে কিন্তু বাস্তবতা হল যারা হাইকোর্টে সনদ লাভের পর বাস্তবে জেলা আদালতে অনেক দিন প্রাকটিস করেন বা করেছেন এবং অনেক দিন বিদেশে অবস্থান করেন তাদের ক্ষেত্রেও বিচারক হিসাবে নিয়োগ পেতে বয়স নূন্যপক্ষে ৫০ বৎসর বয়স হওয়া দরকার। পেশাগত সফলতা ও অন্যান্য যোগ্যতা পর্যাপ্ত থাকার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফলাফলের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৬ এর উপধারা ২(ক) তে প্রার্থীর বয়স নূন্যতম ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) করা হয়েছে কিন্তু উর্ধ্বদিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই। বিগত বিচারক নিয়োগকালে বার এর সিনিয়র মেম্বারদের কম নিয়োগ করা হইয়াছে। সেক্ষেত্রে বিচারকর্ম বিভাগ থেকে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে (প্রায় ৬৫ বৎসর এর কাছাকাছি বয়সে) নিয়োগ করা হইয়াছে। সেই বিবেচনায় বার এর প্রবীণ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সদস্য এর নিয়োগ অগ্রাধিকারযোগ্য। বিচারক নিয়োগে অভিজ্ঞতা খুবই প্রয়োজন সাথে সাথে Professionalism এর গুণাবলি যাচাইও দরকার।
The Counsel Law Reports (SpL), 2017 (ষোলতম সংশোধনী মামলা) এর ৮০৭ নম্বর প্যারাগ্রাফে একজন প্রাক্তন মাননীয় প্রধান বিচারপতির রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন সে সময়ে “বিচারক নিয়োগে ভুলের কারণে মহাপ্রলয় ঘটে”। তিনি বিচারব্যবস্থায় সেই সময়ের নিয়োগ নীতির সঠিক প্রয়োগ না করায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানদন্ডের প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই প্রকাশনার ৯০২ নম্বর প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি অন্যান্য বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার সহকর্মী বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সম্মিলিত মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। এই রীতিটি বিচার বিভাগের ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে সে ধারা প্রায় বিলুপ্ত; এই ধরনের মতবিনিময় বা পরামর্শের চর্চা এখন আর তেমনভাবে অনুসৃত হয় না, তবে প্রক্রিয়াটাও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে বিচারপতি নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে বিশেষভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। সাথে সাথে শপথ অনুসারে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই সকল পক্ষকে পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ দিয়ে ন্যায়ানুগ বিচার করা একজন বিচারকের পরম কর্তব্য। তাছাড়া একজন বিচারক কে ব্যক্তি জীবন সৎ, ন্যায়পরায়ণ আইনজ্ঞ ও জ্ঞানপিপাষু হওয়া বাঞ্চনীয়। সুপ্রীম কোর্ট বার থেকে এখনও বেশিরভাগ বিচারক নিয়োগ করা হয়। একজন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর প্রতিভা ও নিরপেক্ষতার মানদন্ড দেখে তাকে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। একজন নিরপেক্ষ ও প্রতিভাবান আইনজীবীর বিচারক হওয়া এবং ভালো গুণাবলীর অধিকারী হওয়া দরকার। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে প্রসঙ্গক্রমে একজন গুনী ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে তাকে উকিলের মতো জ্ঞানবক্তা এবং দরবেশের মতো দৃঢ়চিত্তের কথা উল্লেখ করেন। তাই বিচারক হওয়ার জন্য এই রকম আইনজীবী হওয়া প্রয়োজন। শুধু ভালো আইনজীবী হলে হবে না ভালো শিষ্টাচার (etiquette) এবং নৈতিকতার (morality) অধিকারী হতে হবে। বার ও বেঞ্চ এর ঐতিহ্যবাহী সু-সম্পর্ক বজায় থাকে। শুধু ভালো ফলাফলে নয় অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। সংবিধানের দৃষ্টিকোন থেকে বর্ণিত আইন সঠিকভাবে অনুস্মরণ করা হয়নি। সেখানেও অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় নিয়মের উপেক্ষা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী ২০ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলোর সহিত একটি সাক্ষাতকারে বলেন যে,
“সর্বত্র এখন ‘আমার লোক’ নিয়োগের মনোভাব ভর করেছে। আমি যোগ্য লোক খুঁজব, নাকি আমার লোক নিয়োগ দেব-এটাই একটা জটিলতা হয়ে গেছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে এই অবস্থা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। হাইকোর্টে এমন আইনজীবী রয়েছেন, যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা হয়তো খুব ভালো নয়। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে চৌকস। তাঁকে নিয়োগ দিতে আপত্তি কোথায়? আমি সিলেটের একজন দেওয়ানি ও আরেকজন ফৌজদারি বিষয়ে আইনজীবীকে জানতাম। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু মেধাবী আইনজীবী। অর্থাৎ বারে যোগ দিয়ে তিনি মেহনত করেছেন।”
এছাড়াও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আইন কমিশন ০৫ আগস্ট, ২০১২ সালের একটি রিপোর্টে সুপারিশ করেন যে,
“Article 95(2)(a) should not be interpreted to allow mere enrolment as a lawyer for ten years to qualify for appointment as a Judge of the Supreme Court. According to the Law Commission, the lawyer vying for appointment should be a regular practitioner who has conducted a significant number of cases to the satisfaction of the Chief Justice and other Supreme Court Judges. They should also have a minimum of two years practice of conducting cases before the Appellate Division. As for judicial officers, the Law Commission recommended that one should have a minimum of three years experience as a District Judge to qualify for appointment as a Supreme Court Judge.
২০২৪ সালের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আইনজীবীদের খুবই অভাব দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে পেশায় (irregular) অনিয়ম আইনজীবীদের elite তন্ত্র হোক অথবা আত্মীয় তন্ত্রের কারণে হোক অথবা link up অন্য যে কোন কারণেই হোক বেশিরভাগ আইনজীবীদের থেকেই বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে। যাহা প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী মহোদয়ের ভাষায় আমার লোক নিয়োগ (Doctrine) এর আওতায় পড়ে। সাম্প্রতিকালে ২০২৪ ও ২০২৬ সালের বিচারপতি নিয়োগে আমার লোক নিয়োগ (Doctrine) এর আওতায় নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে। এই কারণে বর্ণিত নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতিবৃন্দ শিখতে শিখতে বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন এতে করে Substantive মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে দেরির কারণ হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যে বিষয়ে যে বিচারপতি পারদর্শি তাদেরকে নিয়োগ করা উচিত। ফলশ্রুতিতে ঐরকম নিয়োগের ফলে মামলা নিষ্পত্তির হার বেশি সম্ভাবনা থাকে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে সিভিল মামলায় শুনানি আগের চেয়ে বা নিকট অতীতের চেয়ে কিছুটা হলেও অনেক কম। এছাড়াও ২০০৯ সালে দেখা যায় আপীল বিভাগের মাননীয় বিচারপতির সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ জন। সেক্ষেত্রে বর্তমানে মামলার সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আপীল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা ৫ জন। সেই অনুপাতে কমপক্ষে ১২-১৫ জন বিচারপতির প্রয়োজন। কোন কারণে উপযুক্ত ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোক পাওয়া না গেলে ভারতীয় ও অন্যান্য দেশের মতো সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের থেকে আপীল বিভাগের বিচারক নেয়া যায়। ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায় ১৯৬৪ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এ প্রথা চালু আছে। সর্বপ্রথম বিচারপতি এস.এম. সিক্রি এরূপ সরাসরি পন্থায় সুপ্রীম কোর্টে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। এখন ভারতের ক্ষেত্রে সর্বশেষ বিচারপতি হিসাবে বিচারপতি ভি মোহনা সরাসরি বার থেকে সর্বোচ্চ আদালতে নিয়োগ পেয়েছেন। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় নারী বিচারপতি যিনি সরাসরি নিযুক্ত হলেন।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান যখন দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ছিলেন তখন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহমুদুল ইসলামকে বিচারপতি হবার অফার দিয়েছিলেন। যাহা লিগ্যাল ইস্যু (ইস্যুর সংখ্যা- ১০) থেকে জানা যায় তিনি হয়তো সংগত কারণে যান নাই। এদিকে বার ও অন্যান্য সংস্থার থেকে দেখা যায় আরো ৬ জন বা আরো বেশি বিচারপতি নিয়োগের মাধ্যমে ৩ টি বেঞ্চ গঠনের দাবী উত্থাপন করেছে। সুযোগ্য লোক পেলে সরাসরি নিয়োগে আইনগত বাধা নাই বলে মনে করি। মূল উদ্দেশ্য বেশি পরিমাণে মামলা নিষ্পত্তি করণ, নিরপেক্ষ স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা বজায় রাখা যাহা আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলোকবর্তিকা হিসাবে কাজ করে। সর্বক্ষেত্রেই আইন মেনে চলা আইনের বাস্তবায়ন করা যেমন 21 BLD (AD) 35 এ বলা হয়েছে Government stands on equal footing with ordinary litigants কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় সেই নীতিগুলো মানা হচ্ছে না। কারণ সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে আছে- “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।”
অষ্টম সংশোধনীতে 41 DLR (AD) 165/224 পৃষ্ঠার রায়ের মামলায় মাননীয় বিচারপতি অনুচ্ছেদ ২৭৪ বদরুল হক চৌধুরী অভিমত পোষণ করেন- “King is not above the law but under the law.”
Writ Jurisdiction/Judicial Review এর ক্ষমতা বিস্তারিত শুনানী ছাড়া স্থগিত করিলে Writ Jurisdiction এর মহাত্ম ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু এর দিকে প্রবহমান হবে।
বাংলেদশ সংবিধানের অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো সমতা নীতি বার ও বেঞ্চ একে অন্যের সম্পূরক ও পরিপূরক।
সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়ে আমরা যখন বিচারকের আসনে আসীন হই, তখন আমাদের সকলের উচিত শপথের প্রতিটি শব্দ আমাদের মাঝে ধারণ করা। বিশেষ কোনো আইনজীবী দাঁড়ালেন, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির মামলা, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির মামলা এসব বিবেচনা না করে সবাইকে একইভাবে বিচার প্রদান করাই আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানে বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে জনগণের জন্য কাজ করার কথা বলা হয়েছে। বিচারপতি জিনাত আরা বলেন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বিচারক ও আইনজীবীদের উপর সমানভাবে বর্তায়। তিনি বলেন, আমার এই দীর্ঘ বিচারক জীবনে আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে বিচারপ্রার্থীকে ন্যায় বিচার দিতে। দুই পক্ষকে শুনে এবং সংশ্লিষ্ট আইন পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে যা সঠিক মনে হয়েছে আমি সেভাবে বিচার করতে চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হয়েছি তা মূল্যায়ন করবেন বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও দেশের জনগণ। বিচারপতি জিনাত আরা হলেন দেশের দ্বিতীয় নারী বিচারক যিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন। দেশের প্রথম নারী বিচারপতিছিলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তিনি ও উভয়পক্ষের শুনানীঅন্তে নিষ্ঠা ও সততার সহিত বিচার কার্য পরিচালনা করিতেন।
আরও একজর বিচারপতি মহোদয় তার অবসরকালে বলেছেন- “বিচারালয় যাতে বাণিজ্যালয় না হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ না করিলে কোন দেশ উন্নতি লাভ করতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের ভূমিকা প্রয়োজন।”
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে মাননীয় বিচারপতিদের দেখা যায় শুনতে অনীহা এই Culture বা সংস্কৃতি গড়ে উঠলে সমগ্র বিচার ব্যবস্থা ক্রমে ক্রমে পঙ্গু হয়ে যাবে। বিশষত সিনিয়র অ্যাডভোকেট বক্তব্য গুরত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। কারণ বিচারপতি মহোদয় শপথকালে যে শপথ নিয়েছেন বাস্তবে যদি শপথের বিপরীতমুখী ব্যঞ্জনা দেখা যায় তাহা নিরপেক্ষ বিচার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে অন্তরায়। সে জন্য ৮ম সংশোধনীর রায়ে যথার্য বলা হয়েছে যে “রাজা আইনের ঊর্ধ্বে নহে” সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার জন্য “কলেজিয়ম সিস্টেমের” মত বা অনুরূপ সুন্দর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার দরকার।
বিগত কিছু দিন আগে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর বিধি ৩ এর অধীনে দরখাস্ত আহবান করিলেও উক্ত আইন ও সংবিধান ব্যত্যয় ঘটিয়ে বেশির ভাগ ভালো ফলাফলধারীকে নিয়োগ প্রদান করে। বিশ্বস্তসূত্রে শুনা যায় যাদের কোনো একটা পরীক্ষার ফলাফল ৩য় স্থানীয় ছিল তাদের আহবান করা হয় নাই। যদিও অনেকের ক্ষেত্রে বহু বৎসরের প্রফেশনাল অজিতা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিচারক নিয়োগে অর্থাৎ বিগত সরকারের আমলে “দুই বন্ধু” তত্ত্ব শক্তিশালী ছিল। গত দুইটি ব্যাচেও বিচারক নিয়োগ একইভাবে “দুই বন্ধু” তত্ত্ব প্রকারান্তরে প্রয়োগের আলামত দেখা যায়। পাশাপাশি অভিজাত তন্ত্র ও এলিট তন্ত্রের/ আত্মীয় তন্ত্রের ও অন্যান্য তন্ত্রের কিছু নমুনাও দেখা যায়।
গুণীজনরা বলে থাকেন বার ও বেঞ্চ একটি পাখির দুটি শাখা বা একটি বন্দুকের দুটি নল, সেহেতু বার ও বেঞ্চের সুম্পর্ক না থাকিলে বিচার এবং আইনের শাসন উন্নত পর্যায়ে পৌঁছাবে না। কতিপয় (কিয়াদাংশ) বিচারপতি বিচার আসনে বসলে মনে করেন যে আইনজীবীরা ইনফিরিয়র। এই ধারণাটি সঠিক নহে। এই প্রসঙ্গে একজন প্রখ্যাত কবির কবিতার দু’টি উল্লেখযোগ্য-
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
আজি এ মহামানবের সাগরতীরে।
মাননীয় বিচারক মহোদয় ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সম্পর্ক ও অনুরূপ বলে মনে করি। কারণ নিরপেক্ষ বিচারালয় প্রতিষ্ঠায় বিচারক ও আইনজীবীদের গভীর সুসম্পর্কের প্রয়োজন। সেই জন্য সম্পর্ক উন্নতি থাকিলে বিচারালয়, সমাজ এবং দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতি উন্নত হবে।
তাই আমরা 35 DLR (AD) 290 পৃষ্ঠায় বর্ণিত নীতিমালার আলোকে বার ও বেঞ্চের সুমধুর সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে উল্লেখ করা যায়- “Both the bar and bench are two arms of the same machinery unless the work done harmoniously justice cannot be properly administered এই জন্য বার ও বে’র সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে এবং সমৃদ্ধির জন্য সাম্য ও ন্যায় বিচার একান্ত দরকার। বিচারকার্যে ন্যায় বিচার এবং বিচার সম্পর্কিত অন্যান্য কার্য যেমন- আইনজীবীদের অধিকার, প্রিভিলেজ ও সকল ক্ষেত্রে সকলের জন্য সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য সাম্য সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ অনুসারে সমতা নীতির আলোকে অন্যান্য প্রাসাঙ্গিক বিচার বিশ্লেষণ করা বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে। অন্যথায় বার ও বেঞ্চের সুসম্পর্কের ঘাটতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়, বিধায় মাননীয় বিচারকবৃদ্ধের প্রতি নিবেদন বর্ণিত/উল্লেখিত রায়, প্রতিষ্ঠিত আইন ও নীতির আলোকে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বির্নিমানে ও বিকাশে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারা উন্নয়নের জন্য সাম্য ও সমতার নীতি অনুসারে সামগ্রিকভাবে বর্ণিত সকল বিষয়সহ ন্যায় বিচারের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সকল সাম্য নীতি অনুসরণ করা খুবই জরুরী অন্যথায় দেশে আইনের শাসন ও সমাজ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। আইন পেশায় সামন্তনীতি বা সিন্ডিকেট প্রথার প্রচলন যেমন রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি কবিতার মর্মানুসারে বৈষম্য ও গ্রাসনীতি কোনোভাবে কাম্য নয়। যাহা ভবিষ্যতে বিচ্ছেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার কারণ হয়ে দাড়াবে। বর্তমানে সিন্ডিকেট নামে একটি শব্দ খুবই বেশি হারে শুনা যায় যাহা ন্যায়বিচার ও সমতা নীতিকে ব্যহত করে এবং পরিনতিতে সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক হারে ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে।
উপসংহারে একটি ঘটনার বিবৃতি দিয়ে বলতে পারি “হযরত মোহাম্মদ (স:) ফাতেমা বিনতে আসাদের চুরির বিচারকালে তাহার নিকটতম ঘনিষ্ঠজন হযরত উসামা বিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুর মাধ্যমে আল্লাহর নবীর কাছে সুপারিশ করালেন। এ কারণে আল্লাহর নবী খুবই অসন্তুষ্ট হলেন এবং উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বললেন, ‘ইসলামের দন্ডবিধি কার্যকর না করার ব্যাপারে এ ধরনের সুপারিশ করা মারাত্মক অন্যায়। ফাতেমা বিনতে আসাদ কেন, যদি ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ কাজ করতো, তাহলে অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দিতাম। তোমাদের পূর্বে কতক জাতি বিচার ব্যবস্থায় যখন অবৈধ সুপারিশ ও পক্ষপাতিত্ব শুর করেছিল, তখনই আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন।”” তাই নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় লক্ষে এবং বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্র সহ সকল ক্ষেত্রে সাম্য ও সুষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ বিচার ব্যবস্থা কাম্য।
লেখক পরিচিতি:
এম. খালেদ আহমদ
সিনিয়র আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট























