ডেঙ্গুতে পেঁপে পাতার রস: প্লেটলেট বাড়ে, নাকি নিছক প্রচলিত ধারণা?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:০০:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে প্লেটলেট কমে যাওয়াকে কেন্দ্র করে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। এ সময় অনেকেই দ্রুত প্লেটলেট বাড়ানোর আশায় পেঁপে পাতার রস বা নির্যাস খাওয়ার পরামর্শ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে আছে, পেঁপে পাতার রস ডেঙ্গু রোগীর প্লেটলেট বাড়াতে কার্যকর। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা এই দাবিকে কতটা সমর্থন করে?
গবেষণায় পেঁপে পাতার নির্যাস ব্যবহারের পর কিছু ডেঙ্গু রোগীর প্লেটলেটের মাত্রা দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে প্লেটলেট বাড়লেই যে রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হবে, রক্তক্ষরণ বা জটিলতার ঝুঁকি কমবে কিংবা মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস পাবে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে পেঁপে পাতাকে ডেঙ্গুর স্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
দিল্লির অ্যাপোলো স্পেকট্রা হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট-ইন্টারনাল মেডিসিন চিকিৎসক ডা. সঞ্চয়ন রায় ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমে যাওয়ার কারণ, পেঁপে পাতার সম্ভাব্য কার্যকারিতা এবং এ বিষয়ে গবেষণার সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করেছেন।
ডেঙ্গুতে কেন কমে যায় প্লেটলেট?
ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এর পেছনে একাধিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া কাজ করে। ভাইরাসের প্রভাবে অস্থিমজ্জার স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে প্লেটলেট তৈরির প্রক্রিয়া এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় পূর্বসূরি কোষের উৎপাদন কমে যায়।
অন্যদিকে, শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায় প্লেটলেট দ্রুত ধ্বংস হতে পারে বা রক্তপ্রবাহ থেকে অপসারিত হতে পারে। প্রদাহজনিত প্রক্রিয়াতেও প্লেটলেট সক্রিয় হয়ে ব্যবহৃত হয়।
ডা. সঞ্চয়ন রায়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডেঙ্গুর জ্বরের পর্যায় থেকে সংকটজনক পর্যায়ে যাওয়ার সময় প্লেটলেটের মাত্রা কমতে দেখা যায়। তবে শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দিয়ে রোগীর অবস্থা কতটা গুরুতর, তা নির্ধারণ করা যায় না।
এ ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক উপসর্গ, হেমাটোক্রিট, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলও বিবেচনায় নিতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকাতেও ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে এসব সূচক পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পেঁপে পাতার রসে কি সত্যিই প্লেটলেট বাড়ে?
পেঁপে পাতার সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণার পেছনে রয়েছে এতে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান। এর মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনলিক যৌগ উল্লেখযোগ্য। গবেষকদের ধারণা, এসব উপাদান প্লেটলেট তৈরি কিংবা প্লেটলেট ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে মেগাকারিওসাইট এবং থ্রম্বোপোয়েটিক পথের ওপর পেঁপে পাতার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে মানুষের শরীরে এসব উপাদান ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কিছু গবেষণায় ডেঙ্গু রোগীদের পেঁপে পাতার নির্যাস দেওয়ার পর প্লেটলেটের সংখ্যা তুলনামূলক দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে চারটি পরীক্ষার মোট ৪৩৯ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে পেঁপে পাতার নির্যাসের সঙ্গে প্লেটলেট বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেলেও গবেষকেরা আরও বড় ও উন্নত মানের গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল, কিন্তু প্রমাণ কতটা শক্ত?
পেঁপে পাতার কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, সব গবেষণায় একই ধরনের প্রস্তুতি, মাত্রা কিংবা প্রয়োগপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। কোথাও পাতার রস, কোথাও নির্যাস, আবার কোথাও ভিন্ন মাত্রার প্রস্তুতি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এক গবেষণার ফল অন্য ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন।
পেঁপে পাতার রস নিয়ে প্রকাশিত স্কোপিং রিভিউতেও গবেষণার ধরন ও প্রস্তুতির ভিন্নতা উঠে এসেছে। সেখানে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসক ডা. সঞ্চয়ন রায়ের মতে, প্লেটলেটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে রোগীর সামগ্রিক সুস্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ ডেঙ্গুর জটিলতা নির্ভর করে একাধিক শারীরিক সূচক ও উপসর্গের ওপর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর জন্য এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা নেই। রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসাই ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি।
পেঁপে পাতার রস খেলে ঝুঁকি আছে কি?
অনেকে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে পেঁপে পাতার রসকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু প্রাকৃতিক হলেই কোনো উপাদান ঝুঁকিমুক্ত—এমন ধারণা সঠিক নয়।
বাড়িতে তৈরি পেঁপে পাতার রসের ঘনত্ব ও উপাদান একেকবার একেক রকম হতে পারে। বাজারে পাওয়া বিভিন্ন নির্যাস বা পণ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য নেই। কারও কারও ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা কিংবা অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। প্রস্তুতপ্রণালির কারণে দূষণ এবং অন্য ওষুধের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, পেঁপে পাতার রসের ওপর নির্ভর করে কেউ যদি চিকিৎসা নিতে দেরি করেন, তাহলে ডেঙ্গুর গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে।
ডা. রায়ের পরামর্শ, ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ পেঁপে পাতার রস বা অন্য কোনো ভেষজ উপাদান ব্যবহার করতে চাইলে আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এসব উপাদানের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়।
প্লেটলেট কমলেই কি রোগীর অবস্থা সংকটজনক?
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় প্লেটলেটের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। চিকিৎসকেরা রোগীর পেটের তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা ও অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো সতর্কতামূলক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন।
পাশাপাশি রক্তচাপ, নাড়ির গতি, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং হেমাটোক্রিটের পরিবর্তনও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। বিশেষ করে প্লেটলেট কমার পাশাপাশি হেমাটোক্রিট বেড়ে গেলে শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠ চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
তীব্র রক্তক্ষরণ, শক, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জটিলতা কিংবা পর্যাপ্ত তরল গ্রহণে অক্ষমতার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।
চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমে যাওয়া রোগের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। তবে শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে চিকিৎসা করা যথেষ্ট নয়। রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, সতর্কতামূলক লক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল বিবেচনা করেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
পেঁপে পাতার নির্যাস নিয়ে কিছু গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও এটিকে ডেঙ্গুর প্রমাণিত চিকিৎসা বলার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই। তাই পেঁপে পাতার রসের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাই নিরাপদ পথ।

















