কুয়াকাটার শুঁটকিতে দূষণের ঝুঁকি বেশি
শুঁটকির ২৪ নমুনার সব কটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক, শনাক্ত ৯ ধরনের কণা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২৬:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় জনপ্রিয় শুঁটকি মাছেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল গবেষকের পরীক্ষায় উপকূলীয় চারটি এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ছয় প্রজাতির শুঁটকির ২৪টি নমুনার সব কটিতেই প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা শনাক্ত হয়েছে। নমুনাগুলোতে পাওয়া গেছে নয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর মধ্যে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিস্টাইরিন (পিএস) উল্লেখযোগ্য।
গবেষণার ফলাফল শুঁটকি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি সামনে এনেছে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে শুঁটকির মাধ্যমে মানুষের শরীরে এসব কণা প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় সহযোগিতা করেন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া ও সানজিদা জুঁথি।
গবেষণার জন্য দেশের শুঁটকি উৎপাদনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা—কক্সবাজার, টেকনাফ, সুন্দরবনের দুবলার চর ও কুয়াকাটা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার আওতায় ছিল লইট্টা, ছুরি, পোয়া, ফাইস্যা, হরিনা চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ির শুঁটকি। পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর গবেষকেরা ২৪টি নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
কুয়াকাটার শুঁটকিতে দূষণের ঝুঁকি বেশি
গবেষণার ফলাফলে অঞ্চলভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকিতে পার্থক্য দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি পাওয়া গেছে কুয়াকাটার শুঁটকিতে। এরপর রয়েছে কক্সবাজারের শুঁটকি।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স অনুযায়ী, কুয়াকাটার শুঁটকিতে সূচকের মান ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭। কক্সবাজারের শুঁটকিতে এ মান ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১।
গবেষণায় নয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিস্টাইরিন (পিএস) সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। প্লাস্টিকের এসব উপাদান পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে বড় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে তা জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে গবেষণায় সব নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও শুধু এই ফলাফলের ভিত্তিতে শুঁটকি খাওয়ার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।
মাছ থেকে শুকানো—দূষণের একাধিক উৎস
গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের মতে, উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকায় পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বাড়ছে। দৈনন্দিন ব্যবহারের প্লাস্টিক বর্জ্যের পাশাপাশি পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও শিল্পকারখানার বর্জ্যও উপকূলীয় পরিবেশ দূষিত করছে।
তিনি জানান, প্লাস্টিক সহজে পচে বা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয় না। দীর্ঘ সময় পরিবেশে পড়ে থেকে তা ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এসব কণা জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
শুধু সমুদ্র বা উপকূলীয় পানিই নয়, মাছ শুকানোর প্রক্রিয়াতেও শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাছ শুকানোর কাজে ব্যবহৃত রশি, ডিপিংয়ের উপকরণ এবং মাছ ধরার জালে থাকা প্লাস্টিক থেকেও দূষণ ছড়াতে পারে।
মাছ ধরার সময় ছিঁড়ে যাওয়া জাল উপকূলে পড়ে থাকলে তা পরিবেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ায়। এ ছাড়া শুঁটকি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রী থেকেও দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খান।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় পানি ও জলাশয়ে যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা জরুরি। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গবেষণার ফলাফল শুঁটকির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। তবে দূষণের উৎসগুলো আলাদাভাবে শনাক্ত করা, মানুষের খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শের মাত্রা নিরূপণ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব মূল্যায়নে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিরাপদ উৎপাদনপ্রক্রিয়া, প্লাস্টিকের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।




















