ঢাকা ০২:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকৃতির কল্যাণে

​শহিদুল ইসলাম দইচ
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক গ্রাম ‘সবুজপুর’। গ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে এক স্বচ্ছ নদী, যার দুই পাড়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। এই গ্রামের এক কোণে ছোট্ট কুটিরে বাস করেন বৃদ্ধ সোলায়মান সাহেব। তিনি একজন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ মানুষ। গ্রামের তরুণদের জীবনের সঠিক পথ দেখানোর এক নিঃস্বার্থ মশালধারী তিনি।

​একদিন বিকেলের মায়াবী আলোয় গ্রামের একদল তরুণ তাঁর উঠোনে এসে জড়ো হলো। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আদিব। আদিবদের চোখে অনেক স্বপ্ন, কিন্তু বুকভরা সংশয়। তারা সোলায়মান সাহেবের কাছে জানতে চাইল—কীভাবে জীবনে সফল হওয়া যায় এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা যায়।

​সোলায়মান সাহেব মুচকি হেসে বললেন, “শোনো আদিব, ইতিহাস তো তারাই পড়বে যাদের নীতি-নৈতিকতা আর চারিত্রিক উদারতা পাহাড়ের মতো অটল। জীবনে কখনো নৈতিকতার সাথে আপোষ করে না। মনে রেখো, ঐশ্বর্যের চেয়ে দামি সম্পদ হলো বুদ্ধিমত্তা, আর সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য হচ্ছে মূর্খতা। আর ভয় পাওয়া? ওটাই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”

​তিনি আদিবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তুমি যদি নেতা হতে চাও, তবে মনে রেখো—নেতৃত্ব মানে বোঝাপড়া। এখানে ভুল করলে খেসারত দিতেই হবে। একজন প্রকৃত নেতার কাজ হলো মানুষের হৃদয় জয় করা, অহংকার দিয়ে নয়, বিনয় দিয়ে। উদারতা হতে হবে আকাশের মতো বিশাল।”

​তরুণদের একজন জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা দাদু, আমরা বন্ধু নির্বাচন করব কীভাবে?”

​সোলায়মান সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, “বন্ধুত্ব করার আগে বিচক্ষণ হতে হবে। বোকার সাথে কখনো বন্ধুত্ব করবে না; সে তোমার উপকার করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই বড় ক্ষতি করে বসবে। কৃপণের সাথেও নয়; কারণ বিপদের দিনে সে পাশে না থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে। পরনিন্দাকারী তোমাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে, আর মিথ্যাবাদী হলো মরীচিকার মতো—সে দূরের জিনিসকে কাছে আর কাছের সত্যকে দূরে সরিয়ে দেবে। তাই সবসময় একজন হৃদয়বান মানুষের সঙ্গ খুঁজবে।”

​তিনি নদীর ওপারের সূর্যাস্তের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “সবচেয়ে বড় সত্য কী জানো? এইপ্রকৃতির সৌন্দর্যই নিহিত আছে প্রকৃত সুখ। পৃথিবীতে যার চাহিদা যত কম, সে তত বেশি সুখী। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যকে ধারণ করতে পারলে মানুষের মন পবিত্র হয়। যে কাজ মানবকল্যাণে আসে না, তেমন কোনো কাজ করা যাবে না।মানবতার কল্যাণে আমাদের আসতেই হবে।

​আদিব বলল, “কিন্তু দাদু, আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি তো খুব কঠিন। আমরা কীভাবে এই সমাজ বদলাবো?”
​সোলায়মান সাহেব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে পৃথিবী বদলে যাবে। চিন্তাশক্তি বদলালে এই পৃথিবীতে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যাবে। তবে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ হয় ও সচেষ্ট হয়। লড়াই আমাদের করতেই হবে, তবে তা হিংসার লড়াই নয়, তা হলো সৃষ্টির কল্যাণের লড়াই।”

​তিনি তরুণের দলটির চোখের দিকে তাকিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় দর্শনের কথা মনে করিয়ে দিলেন—
“আমরা সবাই এই পৃথিবীতে পরকালের যাত্রী। চোখ খুললেই সকাল, আর চোখ না খুললেই পরকাল। তাই যে ব্যক্তি আখেরাতকে নিজের আসল লক্ষ্যবস্তু বানাবে।, দুনিয়াকে স্রষ্টা তার পায়ের নিচে এনে দেবেন।”

​সোলায়মান সাহেবের এই অমৃত বাণী তরুণদের মনের অন্ধকার দূর করে দিল। আদিব এবং তার বন্ধুরা বুঝতে পারল, প্রকৃতির মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। তারা প্রতিজ্ঞা করল, প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যকে রক্ষা করবে, মানুষের পাশে দাঁড়াবে এবং নৈতিকতা নিয়ে বাঁচবে।

​সত্যিই, প্রকৃতির সৌন্দর্যে দীক্ষিত হয়ে এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করে যদি জীবনকে গড়ে তোলা যায়, তবেই সেই জীবনের সার্থকতা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

প্রকৃতির কল্যাণে

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক গ্রাম ‘সবুজপুর’। গ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে এক স্বচ্ছ নদী, যার দুই পাড়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। এই গ্রামের এক কোণে ছোট্ট কুটিরে বাস করেন বৃদ্ধ সোলায়মান সাহেব। তিনি একজন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ মানুষ। গ্রামের তরুণদের জীবনের সঠিক পথ দেখানোর এক নিঃস্বার্থ মশালধারী তিনি।

​একদিন বিকেলের মায়াবী আলোয় গ্রামের একদল তরুণ তাঁর উঠোনে এসে জড়ো হলো। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আদিব। আদিবদের চোখে অনেক স্বপ্ন, কিন্তু বুকভরা সংশয়। তারা সোলায়মান সাহেবের কাছে জানতে চাইল—কীভাবে জীবনে সফল হওয়া যায় এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা যায়।

​সোলায়মান সাহেব মুচকি হেসে বললেন, “শোনো আদিব, ইতিহাস তো তারাই পড়বে যাদের নীতি-নৈতিকতা আর চারিত্রিক উদারতা পাহাড়ের মতো অটল। জীবনে কখনো নৈতিকতার সাথে আপোষ করে না। মনে রেখো, ঐশ্বর্যের চেয়ে দামি সম্পদ হলো বুদ্ধিমত্তা, আর সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য হচ্ছে মূর্খতা। আর ভয় পাওয়া? ওটাই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”

​তিনি আদিবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তুমি যদি নেতা হতে চাও, তবে মনে রেখো—নেতৃত্ব মানে বোঝাপড়া। এখানে ভুল করলে খেসারত দিতেই হবে। একজন প্রকৃত নেতার কাজ হলো মানুষের হৃদয় জয় করা, অহংকার দিয়ে নয়, বিনয় দিয়ে। উদারতা হতে হবে আকাশের মতো বিশাল।”

​তরুণদের একজন জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা দাদু, আমরা বন্ধু নির্বাচন করব কীভাবে?”

​সোলায়মান সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, “বন্ধুত্ব করার আগে বিচক্ষণ হতে হবে। বোকার সাথে কখনো বন্ধুত্ব করবে না; সে তোমার উপকার করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই বড় ক্ষতি করে বসবে। কৃপণের সাথেও নয়; কারণ বিপদের দিনে সে পাশে না থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে। পরনিন্দাকারী তোমাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে, আর মিথ্যাবাদী হলো মরীচিকার মতো—সে দূরের জিনিসকে কাছে আর কাছের সত্যকে দূরে সরিয়ে দেবে। তাই সবসময় একজন হৃদয়বান মানুষের সঙ্গ খুঁজবে।”

​তিনি নদীর ওপারের সূর্যাস্তের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “সবচেয়ে বড় সত্য কী জানো? এইপ্রকৃতির সৌন্দর্যই নিহিত আছে প্রকৃত সুখ। পৃথিবীতে যার চাহিদা যত কম, সে তত বেশি সুখী। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যকে ধারণ করতে পারলে মানুষের মন পবিত্র হয়। যে কাজ মানবকল্যাণে আসে না, তেমন কোনো কাজ করা যাবে না।মানবতার কল্যাণে আমাদের আসতেই হবে।

​আদিব বলল, “কিন্তু দাদু, আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি তো খুব কঠিন। আমরা কীভাবে এই সমাজ বদলাবো?”
​সোলায়মান সাহেব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে পৃথিবী বদলে যাবে। চিন্তাশক্তি বদলালে এই পৃথিবীতে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যাবে। তবে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ হয় ও সচেষ্ট হয়। লড়াই আমাদের করতেই হবে, তবে তা হিংসার লড়াই নয়, তা হলো সৃষ্টির কল্যাণের লড়াই।”

​তিনি তরুণের দলটির চোখের দিকে তাকিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় দর্শনের কথা মনে করিয়ে দিলেন—
“আমরা সবাই এই পৃথিবীতে পরকালের যাত্রী। চোখ খুললেই সকাল, আর চোখ না খুললেই পরকাল। তাই যে ব্যক্তি আখেরাতকে নিজের আসল লক্ষ্যবস্তু বানাবে।, দুনিয়াকে স্রষ্টা তার পায়ের নিচে এনে দেবেন।”

​সোলায়মান সাহেবের এই অমৃত বাণী তরুণদের মনের অন্ধকার দূর করে দিল। আদিব এবং তার বন্ধুরা বুঝতে পারল, প্রকৃতির মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। তারা প্রতিজ্ঞা করল, প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যকে রক্ষা করবে, মানুষের পাশে দাঁড়াবে এবং নৈতিকতা নিয়ে বাঁচবে।

​সত্যিই, প্রকৃতির সৌন্দর্যে দীক্ষিত হয়ে এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করে যদি জীবনকে গড়ে তোলা যায়, তবেই সেই জীবনের সার্থকতা।