ঢাকা ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমতল ভূমিতেও বালুখেকোদের থাবা, ঝুঁকিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র-ফসলি জমি-জনপদ

সিলেট ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫০:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নদী বা নদীতীর নয়, এবার সমতল ভূমিতেই নেমেছে বালুখেকোদের থাবা। পুকুর খননের আড়ালে গভীর গর্ত করে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফসলি জমি, বসতবাড়ি, পর্যটনকেন্দ্র ও স্থানীয় অবকাঠামো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, থানা পুলিশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাড়ুয়া, রুস্তুমপুর, ভোলাগঞ্জ, কালাইরাগ ও দুপড়িরপাড় এলাকায় পুকুর খননের নামে প্রতিদিন ভারী যন্ত্র ও লিস্টার মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি গভীর জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পাড়ুয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানা ঘেঁষে প্রায় ৬০ শতক জমি কিনে একটি সিন্ডিকেট গত দুই মাস ধরে বালু উত্তোলন করছে। প্রথমে এক্সকাভেটর (পেলোডার) দিয়ে মাটি কেটে পরে গভীর গর্ত থেকে লিস্টার মেশিনে বালু তোলা হচ্ছে। এতে বর্ষায় ভূমিধসের আশঙ্কায় বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আহমদের প্রভাব এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন বন্ধ এবং একটি সচল থাকলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

রুস্তুমপুরের তিনতলা এলাকায়ও একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের দাবি, থানা পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ছয় মাসে বিশাল এলাকা গভীর গর্তে পরিণত হলেও স্থানীয়দের অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির পেছন ও ধলাই সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকেও প্রতিদিন ট্রলিযোগে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। ফাঁড়ির পাশের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট-এর চেয়ারম্যান আলকাছ আলী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে দয়ারবাজার সংলগ্ন কালাইরাগ এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে পুরো গ্রাম জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন আগে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে প্রায় তিন লাখ ঘনফুট বালু জব্দ করলেও পরে আবারও উত্তোলন শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এছাড়া উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের দুপড়িরপাড়, শিবনগর ও মনুরপাড় এলাকাতেও নদীর পাড় কেটে প্রতিদিন বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বর্তমানে কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের তথ্য আমার কাছে নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রবিন মিয়া বলেন, “বর্তমানে কোথাও বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে যেখানে অভিযোগ পাওয়া যায়, সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়।” তবে তথ্য না থাকলে অভিযান কীভাবে পরিচালিত হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যখন যেখানে পাই, সেখানেই অভিযান করি।”

এদিকে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কোম্পানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে জনবসতি, কৃষিজমি, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

সমতল ভূমিতেও বালুখেকোদের থাবা, ঝুঁকিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র-ফসলি জমি-জনপদ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫০:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

নদী বা নদীতীর নয়, এবার সমতল ভূমিতেই নেমেছে বালুখেকোদের থাবা। পুকুর খননের আড়ালে গভীর গর্ত করে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফসলি জমি, বসতবাড়ি, পর্যটনকেন্দ্র ও স্থানীয় অবকাঠামো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, থানা পুলিশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাড়ুয়া, রুস্তুমপুর, ভোলাগঞ্জ, কালাইরাগ ও দুপড়িরপাড় এলাকায় পুকুর খননের নামে প্রতিদিন ভারী যন্ত্র ও লিস্টার মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি গভীর জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পাড়ুয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানা ঘেঁষে প্রায় ৬০ শতক জমি কিনে একটি সিন্ডিকেট গত দুই মাস ধরে বালু উত্তোলন করছে। প্রথমে এক্সকাভেটর (পেলোডার) দিয়ে মাটি কেটে পরে গভীর গর্ত থেকে লিস্টার মেশিনে বালু তোলা হচ্ছে। এতে বর্ষায় ভূমিধসের আশঙ্কায় বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আহমদের প্রভাব এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন বন্ধ এবং একটি সচল থাকলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

রুস্তুমপুরের তিনতলা এলাকায়ও একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের দাবি, থানা পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ছয় মাসে বিশাল এলাকা গভীর গর্তে পরিণত হলেও স্থানীয়দের অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির পেছন ও ধলাই সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকেও প্রতিদিন ট্রলিযোগে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। ফাঁড়ির পাশের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট-এর চেয়ারম্যান আলকাছ আলী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে দয়ারবাজার সংলগ্ন কালাইরাগ এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে পুরো গ্রাম জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন আগে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে প্রায় তিন লাখ ঘনফুট বালু জব্দ করলেও পরে আবারও উত্তোলন শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এছাড়া উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের দুপড়িরপাড়, শিবনগর ও মনুরপাড় এলাকাতেও নদীর পাড় কেটে প্রতিদিন বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বর্তমানে কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের তথ্য আমার কাছে নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রবিন মিয়া বলেন, “বর্তমানে কোথাও বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে যেখানে অভিযোগ পাওয়া যায়, সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়।” তবে তথ্য না থাকলে অভিযান কীভাবে পরিচালিত হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যখন যেখানে পাই, সেখানেই অভিযান করি।”

এদিকে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কোম্পানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে জনবসতি, কৃষিজমি, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।