ঢাকা ০১:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

প্রিয়জন-প্রয়োজন, বাস্তবতা ও সম্পর্ক

শহিদুল ইসলাম দইচ
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:০৫:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ ২১২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

​মানুষ কখনো কখনো কোনো কিছু না বুঝেই নিজের ইচ্ছামতো জীবনের পথে পথ চলে। আর এই চলার পথে চলতে চলতেই আচমকা কারো না কারো সাথে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক। সেইসব সম্পর্কের হয়তো কোনো সুনির্দিষ্ট নাম থাকে না। কেবল চেনা-জানার পরিধি থেকেই তৈরি হয় এক অদ্ভুত টান, যেখানে জড়িয়ে থাকে একে অপরের প্রয়োজন আর রূঢ় বাস্তবতা।

​মানুষের জীবনটা অনেকটা অন্ধকারে পথ চলা এক অন্ধ মানুষের মতো। যে অন্ধ মানুষটি তার চারপাশ দেখতে পায় না, সে সম্পূর্ণ নির্ভর করে একটি লাঠির ওপর। সেই লাঠিটিই তাকে পথ দেখায়, নিরাপত্তা দেয় এবং তার দৈনন্দিন পথচলার একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে হঠাৎ করেই চোখের আলো ফিরে পায়, তখন প্রথমেই সে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সেই চিরচেনা লাঠিটিকে। কারণ, তার কাছে তখন লাঠির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।

​সম্পর্কের রূপক ও নির্মম বাস্তবতা

​এই দৃশ্যটি কেবল একজন অন্ধ মানুষের গল্প নয়; বরং এটি আমাদের চারপাশের চেনা মানুষের সম্পর্কের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

​দুঃসময়ের ভরসা: জীবনে আমরা যখন চরম সংকটে পড়ি, তখন কোনো না কোনো মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করি। কেউ হয়তো আমাদের কষ্ট ভাগ করে নেয়, কেউ আবার দুঃসময়ের ভরসা হয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। তখন সেই মানুষটিকেই আমাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তি বলে মনে হয়।

​স্বার্থের অবসান: কিন্তু জীবনের আলো ফিরে এলে, অর্থাৎ প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে—অন্ধ মানুষটি যেমন লাঠি ফেলে দেয়—আমরাও ঠিক তেমনি সেই মানুষটির অবদান আর সম্পর্কের মূল্য ভুলে যাই।

​এটাই মানুষের স্বভাব—প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক। যতক্ষণ স্বার্থ বা উপকার পাওয়া যায়, ততক্ষণ সম্পর্ক টিকে থাকে। স্বার্থপরতা যখন মানুষকে আচ্ছন্ন করে, তখন ভালোবাসা, সম্মান কিংবা কৃতজ্ঞতার জায়গাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

​প্রকৃত সম্পর্কের সংজ্ঞা

​অথচ সত্যিকার সম্পর্কের সৌন্দর্য হলো তা সব সময় প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে থাকবে। যে সম্পর্ক শুধু লাভ-ক্ষতির খতিয়ান এবং হিসাব-নিকাশ করে গড়ে ওঠে, তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী বা মধুর হয় না।

​তাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সম্পর্ককে কেবল প্রয়োজনের দাঁড়িপাল্লায় মূল্যায়ন করা উচিত নয়। যিনি আপনার অন্ধকার দিনগুলোতে লাঠি হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, জীবনে আলো ফিরে এলেও তাকে ভুলে যাওয়া চরম অকৃতজ্ঞতা। প্রকৃত সম্পর্কের মর্যাদা তখনই বোঝা যায়, যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরও একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট থাকে।

​শেষ কথা

​জীবনের পরম সত্য এটাই যে—প্রয়োজন মানুষকে কাছাকাছি আনে, কিন্তু সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজনের বাইরেও আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ধরে রাখতে হয়। তা না হলে, জীবনের প্রয়োজনে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও লাঠির মতোই একদিন অপ্রয়োজনীয় ও অবহেলিত হয়ে ডাস্টবিনে হারিয়ে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

প্রিয়জন-প্রয়োজন, বাস্তবতা ও সম্পর্ক

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:০৫:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

​মানুষ কখনো কখনো কোনো কিছু না বুঝেই নিজের ইচ্ছামতো জীবনের পথে পথ চলে। আর এই চলার পথে চলতে চলতেই আচমকা কারো না কারো সাথে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক। সেইসব সম্পর্কের হয়তো কোনো সুনির্দিষ্ট নাম থাকে না। কেবল চেনা-জানার পরিধি থেকেই তৈরি হয় এক অদ্ভুত টান, যেখানে জড়িয়ে থাকে একে অপরের প্রয়োজন আর রূঢ় বাস্তবতা।

​মানুষের জীবনটা অনেকটা অন্ধকারে পথ চলা এক অন্ধ মানুষের মতো। যে অন্ধ মানুষটি তার চারপাশ দেখতে পায় না, সে সম্পূর্ণ নির্ভর করে একটি লাঠির ওপর। সেই লাঠিটিই তাকে পথ দেখায়, নিরাপত্তা দেয় এবং তার দৈনন্দিন পথচলার একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে হঠাৎ করেই চোখের আলো ফিরে পায়, তখন প্রথমেই সে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সেই চিরচেনা লাঠিটিকে। কারণ, তার কাছে তখন লাঠির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।

​সম্পর্কের রূপক ও নির্মম বাস্তবতা

​এই দৃশ্যটি কেবল একজন অন্ধ মানুষের গল্প নয়; বরং এটি আমাদের চারপাশের চেনা মানুষের সম্পর্কের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

​দুঃসময়ের ভরসা: জীবনে আমরা যখন চরম সংকটে পড়ি, তখন কোনো না কোনো মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করি। কেউ হয়তো আমাদের কষ্ট ভাগ করে নেয়, কেউ আবার দুঃসময়ের ভরসা হয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। তখন সেই মানুষটিকেই আমাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তি বলে মনে হয়।

​স্বার্থের অবসান: কিন্তু জীবনের আলো ফিরে এলে, অর্থাৎ প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে—অন্ধ মানুষটি যেমন লাঠি ফেলে দেয়—আমরাও ঠিক তেমনি সেই মানুষটির অবদান আর সম্পর্কের মূল্য ভুলে যাই।

​এটাই মানুষের স্বভাব—প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক। যতক্ষণ স্বার্থ বা উপকার পাওয়া যায়, ততক্ষণ সম্পর্ক টিকে থাকে। স্বার্থপরতা যখন মানুষকে আচ্ছন্ন করে, তখন ভালোবাসা, সম্মান কিংবা কৃতজ্ঞতার জায়গাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

​প্রকৃত সম্পর্কের সংজ্ঞা

​অথচ সত্যিকার সম্পর্কের সৌন্দর্য হলো তা সব সময় প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে থাকবে। যে সম্পর্ক শুধু লাভ-ক্ষতির খতিয়ান এবং হিসাব-নিকাশ করে গড়ে ওঠে, তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী বা মধুর হয় না।

​তাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সম্পর্ককে কেবল প্রয়োজনের দাঁড়িপাল্লায় মূল্যায়ন করা উচিত নয়। যিনি আপনার অন্ধকার দিনগুলোতে লাঠি হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, জীবনে আলো ফিরে এলেও তাকে ভুলে যাওয়া চরম অকৃতজ্ঞতা। প্রকৃত সম্পর্কের মর্যাদা তখনই বোঝা যায়, যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরও একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট থাকে।

​শেষ কথা

​জীবনের পরম সত্য এটাই যে—প্রয়োজন মানুষকে কাছাকাছি আনে, কিন্তু সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজনের বাইরেও আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ধরে রাখতে হয়। তা না হলে, জীবনের প্রয়োজনে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও লাঠির মতোই একদিন অপ্রয়োজনীয় ও অবহেলিত হয়ে ডাস্টবিনে হারিয়ে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক