মালিকানা ও নিরাপত্তা থাকবে রাষ্ট্রের হাতেই
এনসিটির দায়িত্ব পাচ্ছে আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এর পাশাপাশি টার্মিনালটি ঘিরে দীর্ঘদিনের লুটপাটের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ২০১৭ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বর্তমানে টার্মিনালটি বিভিন্ন পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ৯৩ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন হলেও এনসিটিতে তা বর্তমানে ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এ কারণে বর্তমানে টার্মিনালটিতে প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি। ফলে জাহাজের অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ব্যয়ও বাড়ছে।
এ প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এনসিটি পরিচালনার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি
বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল পরিচালনা করছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
জানা গেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে অত্যাধুনিক টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থা, স্মার্ট সফটওয়্যার এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর প্রযুক্তি যুক্ত করবে। পাশাপাশি তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি বড় মাদার ভ্যাসেল পাঠাতে আগ্রহী হতে পারে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
মালিকানা ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের হাতেই
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ অংশীদারিত্বে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ অনুযায়ী বন্দরের জমি, জেটি ও অবকাঠামোর মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কেবল পরিচালনার লাইসেন্স পাবে।
এ ছাড়া বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বহির্নোঙর এলাকায় নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যবহৃত সব তথ্য ও সিসিটিভি ফিড তাৎক্ষণিকভাবে কাস্টমস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও নতুন গতি
সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রেমিট্যান্সের উৎস। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব সফল হলে ভবিষ্যতে বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বৃহৎ প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তি কেবল একটি টার্মিনাল পরিচালনার বিষয় নয়, বরং চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তর এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ।

















