দেশে ফিরে অনিশ্চয়তা, সামাজিক সংকট ও পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ
সৌদি থেকে ৯ মাসে ফিরেছেন ৯৭৯ নারী, গর্ভাবস্থা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:২৯:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁরা। কারও লক্ষ্য ছিল পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা, কারও স্বপ্ন ছিল সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা। কিন্তু বিদেশের মাটিতে কাজ করতে গিয়ে অনেকের অভিজ্ঞতা হয়েছে ভয়াবহ। নির্যাতন, বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে তাঁদের অনেকেই দেশে ফিরেছেন।
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন ৯৭৯ নারী শ্রমিক। বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কে নথিভুক্ত তথ্যের বরাতে এ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। ফিরে আসা নারীদের মধ্যে কেউ কেউ গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফিরেছেন এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তবে কতজন নারী গর্ভবতী অবস্থায় ফিরেছেন, সে বিষয়ে এখানে উল্লেখিত তথ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথ তৈরি করলেও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই সুযোগ অনেকের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সৌদি আরব থেকে নারীদের ফিরে আসার এই চিত্র তাই শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের নয়, বরং বিদেশে নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রশ্নও সামনে আনছে।
স্বপ্নের বিদেশ, বাস্তবে নির্যাতনের অভিযোগ
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নারী সৌদি আরবসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। দারিদ্র্য, পরিবারের আর্থিক চাপ এবং দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব তাঁদের বিদেশমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ। অনেক নারী রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তাঁদের কারও কারও অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশে ফিরে আসা নারীদের অভিযোগ, নিয়োগকর্তার বাড়িতে তাঁদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়, যথাসময়ে বেতন দেওয়া হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
কিছু নারী যৌন নিপীড়নের অভিযোগও করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফিরেছেন বলে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, চলাচলে বাধা
ফিরে আসা নারীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা তাঁদের পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেন। বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করা এবং দিন-রাত অতিরিক্ত কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর পক্ষে সাহায্য চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, যোগাযোগের সুযোগের অভাব এবং দেশে ফেরার খরচ জোগাড় করতে না পারা তাঁদের সংকট আরও বাড়িয়ে দেয়।
সৌদি আরবের প্রচলিত কাফালা ব্যবস্থায় অভিবাসী শ্রমিকের অবস্থান ও কর্মসংস্থান ঐতিহাসিকভাবে নিয়োগকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ফলে গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতা তাঁদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় আইনগত পরিবর্তন ও সংস্কারের উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে সুরক্ষা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দেশে ফিরেও শেষ হয় না দুর্ভোগ
বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পরও অনেক নারী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না। শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক আঘাত, ঋণের বোঝা এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তাঁদের সামনে নতুন সংকট তৈরি করে।
যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সামাজিক কলঙ্ক ও পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করতে চান না। ফলে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পারা কিংবা প্রত্যাশিত আয় নিয়ে ফিরতে না পারার কারণে অনেক নারী ও তাঁদের পরিবার আর্থিক সংকটেও পড়েন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকলে তাঁদের দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নিয়োগব্যবস্থার জবাবদিহি কোথায়?
নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশে যাওয়ার আগেই নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাই, চাকরির শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং গন্তব্য দেশের আইন ও জরুরি সহায়তা পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রমে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
বিদেশে যাওয়ার পর কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ, নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং দেশে ফেরার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি। নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে দেশে ফেরার পর ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু দেশে ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথও তৈরি করতে হবে।
অভিবাসনে আয় বাড়ছে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটা?
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক অবদানের আড়ালে কোনো শ্রমিকের নির্যাতন, অধিকারহানি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সৌদি আরব থেকে ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ৯৭৯ নারী শ্রমিকের ফিরে আসার তথ্য তাঁদের প্রত্যেকের দেশে ফেরার কারণ প্রমাণ করে না। একইভাবে, ফিরে আসা সব নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। তবে নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা জরুরি।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তাঁদের সুরক্ষা, অভিযোগের প্রতিকার এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে অভিবাসনের স্বপ্ন অনেক নারীর জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হতে পারে।
























