ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পাবনায় আমগাছের ডাল কাটতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু  আসামি ছাড়াতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন প্রতিবন্ধী ভাতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দর্শকের মৃত্যু ৫০ হাজার টাকার বন্ডে জামিন, শান্তিভঙ্গ না করার মুচলেকায় মুক্ত ককরোচ-প্রধান সংবিধান সংস্কারে নতুন পরিষদের দাবি এনসিপির, সংশোধন কমিটিতে ‘না’ সৌদি আরবে হামলার জের: রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ডেঙ্গুর মৃত্যু বাড়ছেই, অক্টোবরে ১৬ দিনে প্রাণ গেল ১০৪ জনের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন করা যাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছর পর মাঠে গড়াল টাঙ্গাইল প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ

আসামি ছাড়াতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক আসামিকে ছাড়িয়ে দিতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন এবং চুরির মামলায় ফাঁসানোর হুমকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর মোহাম্মদপুর থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন ও উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রতন মিয়ার দিকে। এ ঘটনায় ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন রুনা আক্তার নামে এক নারী।

রুনার অভিযোগ, গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকা থেকে ২০–২৫ জনের একটি দল তাঁর স্বামী মামুনকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী মোহাম্মদপুর থানায় রয়েছেন। কিন্তু তাঁকে কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রুনার আরও অভিযোগ, স্বামীকে ছাড়িয়ে নিতে ৩০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে চুরির মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, পুলিশের দাবি, মামুন একটি চোর চক্রের সদস্য এবং তাঁর বিরুদ্ধে চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, একটি চোর চক্রের সদস্যের বক্তব্যে ওই ঘটনায় মামুনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ এসেছে।

mamla 1

বাড়িতে হামলা চালিয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

রুনা আক্তারের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আদাবর থানার শ্যামলী হাউজিংয়ের দ্বিতীয় প্রকল্পের একটি বাড়িতে ২০–২৫ জনের একটি দল জোরপূর্বক প্রবেশ করে। তাঁর ভাষ্য, মাসুদ রানা ও বিপ্লবের নেতৃত্বে আসা দলটি বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালায়, আসবাবপত্র তছনছ করে এবং তাঁর স্বামী মামুনকে খুঁজতে থাকে।

একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজনের সামনেই মামুনকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও স্বামীর সন্ধান না পেয়ে ওই রাতেই আদাবর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রুনা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিডি নম্বর ৬৫০, তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৬।

রুনার দাবি, পরে রাত আনুমানিক ১০টা ৫০ মিনিটে লোকমুখে জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে মোহাম্মদপুর থানায় নেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে সেখানে গেলে সাদাপোশাকে থাকা পুলিশ সদস্য রতন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরদিন ১১ অক্টোবর স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে থানায় গেলে এসআই রতন তাঁকে বলেন, মামুনের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। রুনার অভিযোগ, ওই সময় স্বামীকে ছাড়িয়ে নিতে ৩০ লাখ টাকা জোগাড় করার কথা বলা হয়। টাকা না দিলে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা বাজারের রানা জুয়েলার্স থেকে চুরি হওয়া স্বর্ণ ও রুপার অলংকারের মামলায় মামুনকে জড়ানোর হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর। তবে টাকা দাবির অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

আটকের সময় ও স্থান নিয়ে প্রশ্ন

মামুনকে কীভাবে এবং কখন আটক করা হয়েছে, তা নিয়ে রুনার বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে। রুনার দাবি, ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে তাঁর স্বামীকে তুলে নেওয়া হয়। ওই রাতেই তিনি জানতে পারেন, মামুন মোহাম্মদপুর থানায় রয়েছেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর দুপুরে এসআই রতন মামুনকে আদালতে পাঠানোর সময় জানান, ১১ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড় থেকে তাঁকে চুরির মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে।

একদিকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে পরদিন রাতে সড়ক থেকে আটকের বর্ণনা—এই দুই তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মামুনকে প্রকৃতপক্ষে কখন, কোথা থেকে এবং কোন প্রক্রিয়ায় থানায় আনা হয়েছিল, তা নির্ধারণে পুলিশের নথিপত্র পরীক্ষা জরুরি। এ ক্ষেত্রে থানার সাধারণ ডায়েরি, হাজতখানার রেজিস্টার, গ্রেপ্তার মেমো, আদালতে পাঠানো চালানপত্র এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।

রুনার আরও অভিযোগ, আদালতে পাঠানো নথিতে অসত্য তথ্য যুক্ত করে তাঁর স্বামীকে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে।

জিডির তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ

মামুনের সন্ধান না পেয়ে আদাবর থানায় জিডি করার পর শ্যামলী হাউজিং এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই খোরশেদ আলমকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন রুনা।

তাঁর অভিযোগ, ১২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিডির অগ্রগতি জানতে ফোন করলে এসআই খোরশেদ মামুনের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চান। রাজনৈতিক পরিচয় নেই জানালে মামুনকে ‘খারাপ লোক’ বলে মন্তব্য করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, জিডি করার পরও মামুনকে উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ, চিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন

রুনার দাবি, পুলিশি হেফাজতে তাঁর স্বামী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের কারণে মামুন ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। ১২ অক্টোবর তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা না করিয়ে শুধু ওষুধ নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ গুরুতর। এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য চিকিৎসার নথি, মেডিকেল পরীক্ষার প্রতিবেদন, শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং হেফাজতে থাকার সময়কার তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

gd 1

পুলিশের চার্জশিটে যা আছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোকানটি রাতের বেলা তালাবদ্ধ করে যাওয়ার পর পরদিন সকালে এসে মালিক দেখেন, দোকানের গেট ও শাটারের তালা ভাঙা। ভেতরে আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

পুলিশের প্রতিবেদনের পাঠযোগ্য অংশে বলা হয়েছে, দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ১০–১২ জন মুখোশধারী ব্যক্তিকে দেখা যায়। তাঁরা একটি গাড়িতে করে দোকানের সামনে আসেন, তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং পরে সোনা-রুপার গয়না ও একটি ভারী সিন্দুক নিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে মো. মামুন নামের এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে গ্রেপ্তারের সময় ও স্থান হিসেবে ১১ অক্টোবর ২০১৬ইং রাত ১১টা ৩০ মিনিট এবং বেরিবাঁধ তিন রাস্তার মোড় এলাকার উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনের শেষ অংশে মো. মামুনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর একটি ধারায় মামলা থাকার উল্লেখ রয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য কী?

অভিযুক্ত এসআই মো. রতন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এমনকি বসে সামনাসামনি কথা বলার অনুরোধ করেন। পরে তার বক্তব্য নিতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মামুনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মামুনের শ্বশুরবাড়িতে চুরি হওয়া স্বর্ণালংকার ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। এ ছাড়া চোর চক্রের সদস্য হুমায়ুনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় মামুন নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রুনার কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেন, এ বিষয়ে তিনি দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রতন মিয়া অভিযোগকারীর কাছে টাকা চেয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। তবে সে দাবি করেছে উক্ত অভিযোগকারীকে চিনে না। ডিসি তেজগাঁও মিজান স্যার বিস্তারিত জানেন।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান এর সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওসির সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিমের বক্তব্য নেয়ার জন্য শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটের সময় হোয়াটসঅপে কল দিলে ফোন রিসিভ করেননি। এরপর ১২টা ১ মিনিটের সময় ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। ১২টা ১০ মিনিটের সময় তিনি ফিরতি মেসেজ দিয়ে জানান-“পিএম স্যারের ডিউটিতে”। তারপর রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আর কোন উত্তর মেলেনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

আসামি ছাড়াতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক আসামিকে ছাড়িয়ে দিতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন এবং চুরির মামলায় ফাঁসানোর হুমকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর মোহাম্মদপুর থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন ও উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রতন মিয়ার দিকে। এ ঘটনায় ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন রুনা আক্তার নামে এক নারী।

রুনার অভিযোগ, গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকা থেকে ২০–২৫ জনের একটি দল তাঁর স্বামী মামুনকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী মোহাম্মদপুর থানায় রয়েছেন। কিন্তু তাঁকে কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রুনার আরও অভিযোগ, স্বামীকে ছাড়িয়ে নিতে ৩০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে চুরির মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, পুলিশের দাবি, মামুন একটি চোর চক্রের সদস্য এবং তাঁর বিরুদ্ধে চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, একটি চোর চক্রের সদস্যের বক্তব্যে ওই ঘটনায় মামুনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ এসেছে।

mamla 1

বাড়িতে হামলা চালিয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

রুনা আক্তারের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আদাবর থানার শ্যামলী হাউজিংয়ের দ্বিতীয় প্রকল্পের একটি বাড়িতে ২০–২৫ জনের একটি দল জোরপূর্বক প্রবেশ করে। তাঁর ভাষ্য, মাসুদ রানা ও বিপ্লবের নেতৃত্বে আসা দলটি বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালায়, আসবাবপত্র তছনছ করে এবং তাঁর স্বামী মামুনকে খুঁজতে থাকে।

একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজনের সামনেই মামুনকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও স্বামীর সন্ধান না পেয়ে ওই রাতেই আদাবর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রুনা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিডি নম্বর ৬৫০, তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৬।

রুনার দাবি, পরে রাত আনুমানিক ১০টা ৫০ মিনিটে লোকমুখে জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে মোহাম্মদপুর থানায় নেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে সেখানে গেলে সাদাপোশাকে থাকা পুলিশ সদস্য রতন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরদিন ১১ অক্টোবর স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে থানায় গেলে এসআই রতন তাঁকে বলেন, মামুনের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। রুনার অভিযোগ, ওই সময় স্বামীকে ছাড়িয়ে নিতে ৩০ লাখ টাকা জোগাড় করার কথা বলা হয়। টাকা না দিলে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা বাজারের রানা জুয়েলার্স থেকে চুরি হওয়া স্বর্ণ ও রুপার অলংকারের মামলায় মামুনকে জড়ানোর হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর। তবে টাকা দাবির অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

আটকের সময় ও স্থান নিয়ে প্রশ্ন

মামুনকে কীভাবে এবং কখন আটক করা হয়েছে, তা নিয়ে রুনার বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে। রুনার দাবি, ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে তাঁর স্বামীকে তুলে নেওয়া হয়। ওই রাতেই তিনি জানতে পারেন, মামুন মোহাম্মদপুর থানায় রয়েছেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর দুপুরে এসআই রতন মামুনকে আদালতে পাঠানোর সময় জানান, ১১ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড় থেকে তাঁকে চুরির মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে।

একদিকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে পরদিন রাতে সড়ক থেকে আটকের বর্ণনা—এই দুই তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মামুনকে প্রকৃতপক্ষে কখন, কোথা থেকে এবং কোন প্রক্রিয়ায় থানায় আনা হয়েছিল, তা নির্ধারণে পুলিশের নথিপত্র পরীক্ষা জরুরি। এ ক্ষেত্রে থানার সাধারণ ডায়েরি, হাজতখানার রেজিস্টার, গ্রেপ্তার মেমো, আদালতে পাঠানো চালানপত্র এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।

রুনার আরও অভিযোগ, আদালতে পাঠানো নথিতে অসত্য তথ্য যুক্ত করে তাঁর স্বামীকে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে।

জিডির তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ

মামুনের সন্ধান না পেয়ে আদাবর থানায় জিডি করার পর শ্যামলী হাউজিং এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই খোরশেদ আলমকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন রুনা।

তাঁর অভিযোগ, ১২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিডির অগ্রগতি জানতে ফোন করলে এসআই খোরশেদ মামুনের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চান। রাজনৈতিক পরিচয় নেই জানালে মামুনকে ‘খারাপ লোক’ বলে মন্তব্য করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, জিডি করার পরও মামুনকে উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ, চিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন

রুনার দাবি, পুলিশি হেফাজতে তাঁর স্বামী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের কারণে মামুন ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। ১২ অক্টোবর তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা না করিয়ে শুধু ওষুধ নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ গুরুতর। এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য চিকিৎসার নথি, মেডিকেল পরীক্ষার প্রতিবেদন, শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং হেফাজতে থাকার সময়কার তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

gd 1

পুলিশের চার্জশিটে যা আছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোকানটি রাতের বেলা তালাবদ্ধ করে যাওয়ার পর পরদিন সকালে এসে মালিক দেখেন, দোকানের গেট ও শাটারের তালা ভাঙা। ভেতরে আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

পুলিশের প্রতিবেদনের পাঠযোগ্য অংশে বলা হয়েছে, দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ১০–১২ জন মুখোশধারী ব্যক্তিকে দেখা যায়। তাঁরা একটি গাড়িতে করে দোকানের সামনে আসেন, তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং পরে সোনা-রুপার গয়না ও একটি ভারী সিন্দুক নিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে মো. মামুন নামের এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে গ্রেপ্তারের সময় ও স্থান হিসেবে ১১ অক্টোবর ২০১৬ইং রাত ১১টা ৩০ মিনিট এবং বেরিবাঁধ তিন রাস্তার মোড় এলাকার উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনের শেষ অংশে মো. মামুনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর একটি ধারায় মামলা থাকার উল্লেখ রয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য কী?

অভিযুক্ত এসআই মো. রতন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এমনকি বসে সামনাসামনি কথা বলার অনুরোধ করেন। পরে তার বক্তব্য নিতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মামুনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মামুনের শ্বশুরবাড়িতে চুরি হওয়া স্বর্ণালংকার ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। এ ছাড়া চোর চক্রের সদস্য হুমায়ুনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় মামুন নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রুনার কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেন, এ বিষয়ে তিনি দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রতন মিয়া অভিযোগকারীর কাছে টাকা চেয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। তবে সে দাবি করেছে উক্ত অভিযোগকারীকে চিনে না। ডিসি তেজগাঁও মিজান স্যার বিস্তারিত জানেন।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান এর সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওসির সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিমের বক্তব্য নেয়ার জন্য শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটের সময় হোয়াটসঅপে কল দিলে ফোন রিসিভ করেননি। এরপর ১২টা ১ মিনিটের সময় ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। ১২টা ১০ মিনিটের সময় তিনি ফিরতি মেসেজ দিয়ে জানান-“পিএম স্যারের ডিউটিতে”। তারপর রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আর কোন উত্তর মেলেনি।