গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান, আগে থেকেই ছিলেন নিরাপত্তাঝুঁকিতে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:০২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির নামে এক সাংবাদিককে। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি চায়ের দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে গুলি করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাথা, গলা ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। নিহতের পরিবারের দাবি, গুলি করা হয়েছে ছয়টি।
পুলিশের ভাষ্য, দুই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে কাছ থেকে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে তাকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। বেসরকারি একটি ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন (আইপিটিভি) চ্যানেলের নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। তার লেখালেখিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধ ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ কারণে তিনি নিরাপত্তাঝুঁকিতে ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ।
তবে কারা এবং কী কারণে তাকে হত্যা করেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগের হামলা বা হুমকির সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
অনুসরণ করে গুলি, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, লুৎফুজ্জামান আলিফের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সুনই গ্রামে। তিনি দুর্গাপুরের তেলনজিয়া গ্রামে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়িতে থাকতেন। সেখানে তার দুই সন্তান রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ি থেকে কয়েক গজ দূরের একটি চায়ের দোকানে যান তিনি। দোকানে চা পান করার পর ছয়টি সিগারেট কেনেন। ওই সময় আরও দুই অপরিচিত ব্যক্তি দোকান থেকে সিগারেট কেনেন। পরে লুৎফুজ্জামান মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গ্রামীণ পথ ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলে ওই দুই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান তারা।
ওসি খন্দকার শাকের আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের শরীরে অন্তত পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে পরিবারের সদস্যরা ছয়টি গুলির চিহ্ন দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।
ঘটনার পর প্রথম আলোর স্থানীয় সাংবাদিক পল্লব চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে যান। তিনি দোকানদার রবিন রাংছার বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, লুৎফুজ্জামান ওই দোকানে নিয়মিত বসতেন। সেদিন দোকান থেকে বের হয়ে প্রায় ১০ ফুট যাওয়ার পরই তাকে গুলি করা হয়। পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শুনে ভয় পেয়ে দোকানদার ভেতরে আশ্রয় নেন।
ঘটনাস্থলটি দুর্গাপুর থানা থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরে বলে জানান পল্লব চক্রবর্তী।
আগেও হামলার আশঙ্কা, সতর্ক করেছিল পুলিশ
লুৎফুজ্জামান আলিফের ওপর আগেও হামলার চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওসি খন্দকার শাকের আহমেদের দাবি, দেড় থেকে দুই বছর আগে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে চেহারার মিল থাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে তারা ধারণা করেন। নিহত ওই উপপরিদর্শকের সঙ্গে লুৎফুজ্জামানের চেহারা ও মাথার চুলের মিল ছিল বলে স্থানীয় সাংবাদিকদেরও জানিয়েছেন তিনি।
ওসি বলেন, আগের ঘটনার তদন্ত চলছে। তবে সেই ঘটনার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত নয়।
লেখালেখির কারণে লুৎফুজ্জামানের শত্রু বেড়েছিল বলে মনে করতেন ওসি। সে কারণে তাকে একাধিকবার সতর্কও করেছিলেন তিনি। ঘটনার দুই দিন আগেও লুৎফুজ্জামান থানায় এসেছিলেন বলে জানান খন্দকার শাকের আহমেদ।
ওসির ভাষ্য, সেদিন তার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি লুৎফুজ্জামানকে বলেছিলেন, যেসব বিষয়ে তিনি লেখেন, তাতে তার বিরোধী লোকের সংখ্যা বেশি হতে পারে। দুর্গাপুরে এলে কোথায় অবস্থান করছেন, তা যেন থানাকে জানান।
ওসি বলেন, “অফিসার ইনচার্জ হিসেবে বারবার সাবধান করছি যে, আপনি দুর্গাপুরে যখনই আসবেন, আমাকে একটু জানাবেন।”
তার দাবি, নিহত ব্যক্তি নিরাপত্তাঝুঁকিতে ছিলেন এবং লেখালেখির কারণে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
ফেসবুক পেজ নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
পুলিশ জানিয়েছে, ‘রিভার্স নিউজ’ নামে একটি ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে আগে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ। লেখালেখিকে কেন্দ্র করে ওই পেজের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল বলে পুলিশের ভাষ্য।
পেজটি কারা পরিচালনা করে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, তারা পরিচালনাকারীকে চেনেন বলে ধারণা করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা স্বীকার করেন না।
এদিকে, নিহতের পরিবারের সদস্যদের দাবি, কোনো একটি সংবাদ প্রকাশের পর লুৎফুজ্জামানকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে কারা তাকে হুমকি দিয়েছিল, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
লুৎফুজ্জামানের স্ত্রী আনন্দিতা সংমার মা শিলা সংমা বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি একা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মাথা, গলা ও পেটে গুলি করা হয়েছে। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কী করবেন, তা ভেবে দিশাহারা তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন তিনি।
শিলা সংমার মতে, নিহতের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করলে তিনি কার সঙ্গে কথা বলছিলেন বা কারও সঙ্গে বিরোধ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ফোনটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে জানান তিনি।
হত্যা মামলার আসামি জামিনে
ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানিয়েছেন, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত একজনকে আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য।
তবে ওই ব্যক্তির সঙ্গে সাংবাদিক হত্যার কী সম্পর্ক, কিংবা তিনি বর্তমান ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি পুলিশ।
লুৎফুজ্জামান কোনো সাংবাদিক সমিতির সদস্য ছিলেন না এবং প্রচলিত গণমাধ্যমেও তার নিয়মিত সম্পৃক্ততা ছিল না বলে জানিয়েছেন ওসি। তবে স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত ছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা লেখালেখি করতেন।
খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, “উনি ভুঁইফোড় না। উনি সাহসী ছিলেন। উনি যা লিখতেন, অন্যরা তা লেখার সাহস করতো না।”
স্থানীয় সাংবাদিক পল্লব চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিন থেকে চার বছর ধরে তিনি লুৎফুজ্জামানকে চিনতেন। তার বাড়ি পাশের গ্রামে। লুৎফুজ্জামান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও চোরাচালান নিয়ে লিখতেন। তবে তার প্রকাশিত সব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, লুৎফুজ্জামান একসময় সামরিক বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি অবসরে গিয়েছিলেন, চাকরি ছেড়েছিলেন, নাকি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লেখালেখির কারণে বিরোধ, আগের হামলার আশঙ্কা এবং হত্যার আগে পুলিশের সতর্কবার্তা—সব মিলিয়ে লুৎফুজ্জামান আলিফের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তার হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে তদন্তের ফলের অপেক্ষা করতে হবে।




















