ইনানী রিসোর্টে আগুনে প্রাণ হারান একই পরিবারের চারজন
১১ দিন পর গ্রামে ফিরল চারজনের মরদেহ, মণিরামপুরে শোকের মাতম

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১৬:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজারের ইনানী টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো যশোরের মণিরামপুরের একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ দীর্ঘ ১১ দিন পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে মরদেহগুলো মোহনপুর গ্রামে পৌঁছালে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। বাদ জোহর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
নিহতরা হলেন মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা খাতুন এবং তাঁদের দুই মেয়ে ইনায়া ও ইহানা। গত ১৭ অক্টোবর ভোরে কক্সবাজারের ইনানী টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় প্রাণ হারান আরও ছয়জন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার কারণে মরদেহ শনাক্ত করতে সময় লাগে। স্বজনদের অভিযোগ, অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিই তাঁদের পরিবারের চার সদস্যের প্রাণহানির জন্য দায়ী। তাঁরা অবিলম্বে অবৈধ রিসোর্ট বন্ধ, ঘটনার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
পূজার ছুটিতে কক্সবাজার, ফেরা হলো না চারজনের
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং বেড়ানোর উদ্দেশ্যে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যান নাহিদুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী আফসানা খাতুন ও দুই মেয়ে ইনায়া-ইহানা। ১৬ অক্টোবর তাঁরা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাঁদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু তার আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। সেই আগুনেই শেষ হয়ে যায় পুরো পরিবারের চার সদস্যের জীবন।
অগ্নিকাণ্ডের পর মরদেহগুলো শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত সোমবার বিকেলে কক্সবাজার পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পায়। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার পরিবারের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়। বুধবার ভোরে সেগুলো পৌঁছায় গ্রামের বাড়িতে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনদের মরদেহ ফিরে পেলেও স্বজনদের কাছে তা ছিল এক অসহনীয় মুহূর্ত। যে পরিবারটি আনন্দের আশায় কক্সবাজার গিয়েছিল, তাদের ফিরতে হলো চারটি নিথর দেহ হয়ে।
‘পরদিন সকাল থেকে ফোন বন্ধ, পরে গিয়ে কাউকে খুঁজে পাইনি’
নিহত নাহিদুর রহমানের চাচাতো ভাই খালিদুর রহমান বলেন, তিনি টেকনাফে থাকেন। গত ১৬ অক্টোবর নাহিদ তাঁকে ফোন করে রিসোর্টে ওঠার কথা জানিয়েছিলেন।
খালিদুর রহমান বলেন, “পরের দিন সকাল থেকে তার নম্বর বন্ধ পাই। পরে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু ওদের খুঁজে পাইনি। ১৮ অক্টোবর জানানো হয়, চারজনের মরদেহ পাওয়া গেছে, তবে পরিচয় শনাক্ত হয়নি। এরপর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হয়। গতকাল মরদেহগুলো গ্রহণ করেছি, আজ ভোরে বাড়িতে নিয়ে এসেছি। আমাদের পুরো পরিবার শোকাহত।”
নিহতের ফুফাতো ভাই আব্দুস সালাম বলেন, “নাহিদ পূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে কক্সবাজার গিয়েছিল। তাদের এমন নির্মম মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। আসলে বলার মতো কোনো ভাষা নেই। পুরো দেশ ঘটনাটি দেখছে, আর আমাদের পুরো পরিবার মর্মাহত।”
‘একে দুর্ঘটনা বলব না’, বলছেন বাবা
ছোট ছেলের পুরো পরিবার হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন নাহিদুর রহমানের বাবা মতিয়ার রহমান। পরিবারের চার সদস্যকে একসঙ্গে হারানোর শোক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
মতিয়ার রহমান বলেন, “আমার দুটি ছেলে সন্তান। তার মধ্যে ছোট ছেলের পুরো পরিবার আজ মারা গেল। একে আমি দুর্ঘটনা বলব না। অনুমতিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর কারণে আজ আমার পরিবারের চারটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল।”
কাঠ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সরকারের কাছে এসব স্থাপনা বন্ধের দাবি জানান।
তিনি বলেন, “এই যে রিসোর্টগুলো অস্থায়ীভাবে কাঠের তৈরি। সরকারের কাছে আবেদন, এই সমস্ত রিসোর্ট যেন না থাকে, না থাকে।”
তাঁর এই আকুতি শুধু একটি পরিবারের শোকের প্রকাশ নয়, পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও তুলেছে।
‘অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বের হওয়ার পথ নিশ্চিত করতে হবে’
নিহতদের ফুফা আব্দুল মজিদ বলেন, সাধারণ কর্মজীবী মানুষ একটু বিনোদনের আশায় রিসোর্টে যান। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ এবং অতিথিদের নিবন্ধনব্যবস্থা না থাকলে তাঁদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, “দুর্ঘটনায় তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে খুঁজে না পাওয়া কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা হতে পারে না।”
আব্দুল মজিদ আরও বলেন, পর্যটন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত অগ্নিনির্বাপণ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি—ব্যবসা যেন নিয়মমাফিক ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা হয়। পর্যটন এলাকায় শুধু একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন যথেষ্ট নয়, সেখানে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে শাখা-প্রশাখা বাড়াতে হবে।”
বাংলাদেশে আর কোনো পরিবার যেন এমন মর্মান্তিক ঘটনার শিকার না হয়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি অবৈধ রিসোর্ট বন্ধ এবং এ ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
চার প্রাণের মৃত্যু, নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন
নাহিদুর রহমান তুহিন ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা ছিলেন। স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি। পূজার ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভ্রমণই হয়ে উঠল তাঁদের জীবনের শেষ যাত্রা।
এই চারজনের মৃত্যুতে একটি পরিবার হারিয়েছে তার প্রিয় মানুষদের। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্টগুলোর অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনব্যবস্থা এবং তদারকি নিয়ে সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
স্বজনদের দাবি, শুধু শোক প্রকাশ বা ক্ষতিপূরণ নয়—এ ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, নিরাপত্তাবিধি বাস্তবায়ন এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাঁদের প্রত্যাশা, আর কোনো পরিবারকে যেন বিনোদনে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।
























