তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ‘স্টপ লিস্টে’ চট্টগ্রামের প্রকৌশলী দম্পতি, ঢাকার বোরহান-আনিছুর
বিদেশ পালানোর শঙ্কায় চার সিটি কর্মকর্তার দেশত্যাগে কড়াকড়ি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্তাধীন দেশের চার সিটি করপোরেশনের চার কর্মকর্তার বিদেশযাত্রা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তদন্ত চলাকালে তারা গোপনে দেশ ছাড়তে পারেন—এমন আশঙ্কায় তাঁদের বিরুদ্ধে ‘দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা’ কার্যকরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে গত ২৬ জুলাই জারি করা এক গোপনীয় চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। যুগ্মসচিব মো. রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলমান থাকায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিদেশ গমন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারা রয়েছেন তালিকায়
সরকারি চিঠি অনুযায়ী দেশত্যাগে নজরদারির আওতায় রয়েছেন—
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান।
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক ও বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলিকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন।
- চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী, যিনি ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে বদলির আদেশাধীন।
- চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তা, যিনি রংপুর সিটি করপোরেশনে বদলির আদেশাধীন।
শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তা স্বামী-স্ত্রী।
সরকারি সূত্রের ভাষ্য, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, তদন্তাধীন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিদেশে পালানোর চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘স্টপ লিস্ট’ কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিঠির অনুলিপি স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগ, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার দপ্তর, সচিবের দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠানো হয়েছে। মূল চিঠি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি), অতিরিক্ত ডিআইজি (ইমিগ্রেশন) এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে। একই সঙ্গে দেশের সব ইমিগ্রেশন চেকপোস্টকে বিষয়টি অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের প্রকৌশলী দম্পতিকে ঘিরে বিতর্ক
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী দম্পতি মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গত ৯ জুলাই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২৫ জুন চট্টগ্রামের বাসিন্দা মেহেদী চৌধুরী স্থানীয় সরকার বিভাগে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ফাইল বাণিজ্য, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয় উল্লেখ করা হয়।
পরে ২৩ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে শাহীন-উল ইসলামকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং তাঁর স্ত্রী ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়। ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তাঁরা যোগ দেননি। ফলে ২৭ জুলাই থেকে তাঁদের স্ট্যান্ড রিলিজ কার্যকর করা হয়।
বদলির আদেশ চ্যালেঞ্জ করে শাহীন-উল ইসলাম হাইকোর্টে রিট করেন। পরে আদালত রুল জারি করে বদলির আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বদলি স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে তাঁদের চট্টগ্রামেই রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বোরহান উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ পদোন্নতি, অনিয়মের মাধ্যমে তৃতীয় গ্রেডের সুবিধা গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ৫ জুলাই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত সচিব মুহা. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়। নতুন আদেশেও তাঁর বিরুদ্ধে ঠিকাদারি অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধেও তদন্ত
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে গত ৩০ জুন তদন্তের নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ।
একই দিনে তাঁকে প্রশাসনিক কারণে বগুড়া সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরেজমিন অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাসপোর্ট তথ্যও সংযুক্ত
সরকারি চিঠির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তার পাসপোর্টের তথ্যও সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, আনিছুর রহমানের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০৩২ সাল পর্যন্ত, কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এবং শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তার পাসপোর্টের মেয়াদ ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বৈধ রয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিদেশযাত্রা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।





















