জনপ্রশাসনের শীর্ষ পদে ফের রদবদলের আভাস, আলোচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৫০:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
দেশের জনপ্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে আবারও বড় ধরনের রদবদলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। চলতি আগস্টেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। একই সময়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবের পদ শূন্য হওয়ায় প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কাঠামোতে নতুন করে পদায়ন, দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচিবালয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শুধু কয়েকটি শীর্ষ পদে নয়, এর প্রভাব সচিব, অতিরিক্ত সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও পড়তে পারে। ফলে প্রশাসনের ওপরের স্তরে একটি বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইতোমধ্যে চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ায় ৩০ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের পদ শূন্য হয়েছে। বদলির কারণে খালি রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের পদও শূন্য রয়েছে। আগামী অক্টোবরে অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের অবসরে যাওয়ার কথা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হকের পদ। চলতি মাসেই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ এবং প্রশাসনের বদলি-পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কারা আসবেন, তা নিয়ে সচিবালয়ে চলছে নানা জল্পনা।
নিয়মিত কর্মকর্তা নাকি আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ?
জনপ্রশাসনের ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়—সরকার কি এবার নিয়মিত কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেবে, নাকি আবারও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাই অব্যাহত থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাকে নতুন দায়িত্বে আনার আলোচনা রয়েছে। আবার প্রশাসন ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেও পদায়নের পক্ষে মত রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই আসবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ এসব নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। সিদ্ধান্ত এলেই কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ফলে আগাম কোনো নাম নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শীর্ষ প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমানে জনপ্রশাসনে মোট কর্মকর্তা রয়েছেন ৬ হাজার ৬৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তা ৭৯ জন। এর মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত, অর্থাৎ প্রায় ২৯ শতাংশ সচিব বর্তমানে চুক্তির ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রধানরা। অন্যদিকে বর্তমানে ১০ জন সচিবকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে এবং একজন সচিব ওএসডি রয়েছেন।
প্রশাসনের একটি অংশের দাবি, অতীতে পদোন্নতিবঞ্চিত হলেও অভিজ্ঞ এসব কর্মকর্তার দক্ষতা কাজে লাগাতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রয়োজন। তবে অন্য অংশের মত, বহু বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশাসনিক পদে ফিরিয়ে আনা হলে পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয় এবং অপেক্ষমাণ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইলে পরামর্শক বা বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নিয়মিত সচিব পদে অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে এবং কর্মরত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত করে।
কয়েকটি পদে পরিবর্তনেই নড়েচড়ে বসবে পুরো প্রশাসন
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব বা জনপ্রশাসন সচিবের মতো পদে পরিবর্তন মানেই শুধু একজন কর্মকর্তার বদলি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একাধিক মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা এবং মাঠ প্রশাসনের ধারাবাহিক পদায়ন। ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সিদ্ধান্ত এলে প্রশাসনের বড় অংশেই নতুন করে রদবদল দেখা যেতে পারে।
ইতোমধ্যে গত ২৯ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. সাইদুর রহমান খান। একই দিনে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. ফজলুর রহমান। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এগুলোই আসন্ন বৃহত্তর রদবদলের প্রাথমিক ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞের মত
জনপ্রশাসনবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, বিশেষ দক্ষতা বা প্রয়োজনের ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তবে এটি যেন ব্যতিক্রমই থাকে, নিয়মে পরিণত না হয়। অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের স্বাভাবিক পদোন্নতি কাঠামো, কর্মকর্তাদের মনোবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।






















