ঢাকা ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাইসেন্স বাতিল ঘিরে অনিশ্চয়তায় রোগী, নতুন বিতর্কে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চাকরি হারানোর শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হাসপাতালটির শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী।

শুক্রবার সরেজমিনে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের স্বাভাবিক ব্যস্ততা অনেকটাই কমে গেছে। নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকায় অনেকেই চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। আবার চিকিৎসাধীন অনেক রোগী ও তাদের স্বজন চিকিৎসা সেবা নিয়ে শঙ্কায় হাসপাতাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মোকসেদ আলী জানান, লাইসেন্স বাতিলের খবর প্রকাশের পর থেকেই রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন হাসপাতালে থাকার কথা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি স্বজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ধীরে ধীরে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। তবে আইসিইউ, সিসিইউ ও এনআইসিইউতে থাকা গুরুতর রোগীদের বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি কর্তৃপক্ষের।

লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালের অনেক কর্মী ও নার্স। তাদের আশঙ্কা, হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

গত ২৭ মে ভোরে হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয় উঠে আসে।

প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। হাসপাতালের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত জনস্বার্থে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন হাসপাতালের পক্ষে থাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। তার দাবি, হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং প্যাথলজি বিভাগের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশে হাসপাতালের পরিবর্তে প্যাথলজি লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় প্রতিষ্ঠানটিতে ৪১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে এনআইসিইউতে ৬০ নবজাতক, আইসিইউতে ২০ জন এবং সিসিইউতে চারজন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সব মিলিয়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হওয়া তদন্ত এখন হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ, চিকিৎসাসেবা এবং হাজারো মানুষের জীবিকার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। আপিলের পর সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন রোগী, স্বজন ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

লাইসেন্স বাতিল ঘিরে অনিশ্চয়তায় রোগী, নতুন বিতর্কে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চাকরি হারানোর শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হাসপাতালটির শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী।

শুক্রবার সরেজমিনে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের স্বাভাবিক ব্যস্ততা অনেকটাই কমে গেছে। নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকায় অনেকেই চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। আবার চিকিৎসাধীন অনেক রোগী ও তাদের স্বজন চিকিৎসা সেবা নিয়ে শঙ্কায় হাসপাতাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মোকসেদ আলী জানান, লাইসেন্স বাতিলের খবর প্রকাশের পর থেকেই রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন হাসপাতালে থাকার কথা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি স্বজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ধীরে ধীরে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। তবে আইসিইউ, সিসিইউ ও এনআইসিইউতে থাকা গুরুতর রোগীদের বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি কর্তৃপক্ষের।

লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালের অনেক কর্মী ও নার্স। তাদের আশঙ্কা, হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

গত ২৭ মে ভোরে হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয় উঠে আসে।

প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। হাসপাতালের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত জনস্বার্থে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন হাসপাতালের পক্ষে থাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। তার দাবি, হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং প্যাথলজি বিভাগের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশে হাসপাতালের পরিবর্তে প্যাথলজি লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় প্রতিষ্ঠানটিতে ৪১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে এনআইসিইউতে ৬০ নবজাতক, আইসিইউতে ২০ জন এবং সিসিইউতে চারজন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সব মিলিয়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হওয়া তদন্ত এখন হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ, চিকিৎসাসেবা এবং হাজারো মানুষের জীবিকার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। আপিলের পর সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন রোগী, স্বজন ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।