ঢাকা ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২২:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ ৪১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দেওয়া, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই বাজেট দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে প্রণীত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।

এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী Tarique Rahman নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট।

মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য

প্রায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার তদারকি জোরদার এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর ও শুল্ক ছাড়ের মাধ্যমে বাজারে স্বস্তি ফেরানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব

অর্থমন্ত্রী জানান, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, কর কাঠামোকে আরও ব্যবসাবান্ধব করা এবং সরকারি সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ।

এর মধ্যে:

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা
  • অন্যান্য উৎস থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৯১ হাজার কোটি টাকা

করজাল সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর করসেবা এবং রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমার সুযোগ

করদাতাদের জন্য বড় পরিবর্তন হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সুবিধাও পাবেন করদাতারা।

উন্নয়ন ব্যয়ে বড় বরাদ্দ

বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ

নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ একাধিক নতুন কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এই ঘাটতি পূরণে:

  • অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা
  • বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা

অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে অর্থমন্ত্রী কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, জনগণের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও শ্রমই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২২:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দেওয়া, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই বাজেট দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে প্রণীত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।

এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী Tarique Rahman নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট।

মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য

প্রায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার তদারকি জোরদার এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর ও শুল্ক ছাড়ের মাধ্যমে বাজারে স্বস্তি ফেরানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব

অর্থমন্ত্রী জানান, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, কর কাঠামোকে আরও ব্যবসাবান্ধব করা এবং সরকারি সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ।

এর মধ্যে:

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা
  • অন্যান্য উৎস থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৯১ হাজার কোটি টাকা

করজাল সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর করসেবা এবং রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমার সুযোগ

করদাতাদের জন্য বড় পরিবর্তন হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সুবিধাও পাবেন করদাতারা।

উন্নয়ন ব্যয়ে বড় বরাদ্দ

বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ

নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ একাধিক নতুন কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এই ঘাটতি পূরণে:

  • অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা
  • বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা

অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে অর্থমন্ত্রী কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, জনগণের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও শ্রমই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হবে।