পিএসসি সংস্কারসহ ১৩ দফা দাবি শিবিরের, নিয়োগে দলীয় প্রভাব বন্ধের আহ্বান

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২০:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও হয়রানি বন্ধ, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাঠামোগত সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে ১৩ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির অভিযোগ, পিএসসিসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। লিখিত বক্তব্যে তিনি জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসিকে তিনটি পৃথক কমিশনে পুনর্গঠন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং চাকরিপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
পিএসসির কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি
লিখিত বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ন্যায়বিচারপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়ন এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করাই ছিল অন্যতম দাবি। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে পিএসসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা, নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ উঠছে।
তিনি আরও বলেন, গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে সরকার জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিচ্ছে না। পিএসসি, ইউজিসি, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষার অভিযোগও রয়েছে।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দাবি, জুলাই জাতীয় সনদে পিএসসির বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠন করে সংবিধানের অধীনে তিনটি পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কমিশনগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাইয়ে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
মোনেম কমিশনের সংস্কার অব্যাহত রাখার আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন পিএসসি কমিশনের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানানো হয়।
এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—পরিচয় গোপন রেখে কোডভিত্তিক লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, একই খাতার বিভিন্ন প্রশ্ন পৃথক পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়ন, ভাইভায় নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা, মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার পদ্ধতি চালু, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তায় নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস ও প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি।
নূরুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করেন। পরে কমিশনের দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমানের পদত্যাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর চায়ের আমন্ত্রণের পর কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনাও প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ ছাড়া পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনরায় ১০০ থেকে ২০০ করার উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়ন, ফল প্রস্তুত এবং প্রকাশের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
নিয়োগে বৈষম্য ও পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে উদ্বেগ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থীকে নিয়োগপত্র না দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির দাবি, বাদ পড়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড বা নিয়োগ না দেওয়ার যৌক্তিক কারণ জানানো হয়নি। রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে প্রার্থী বাদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ধরনের বৈষম্য সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন নূরুল ইসলাম।
এ ছাড়া সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, লিখিত পরীক্ষার মেধা ও যোগ্যতার গুরুত্ব কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর বরাদ্দ করা হলে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
৪৫তম বিসিএসের গেজেটে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্য থেকে ৫৬ জন এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের গেজেটে প্রথম দফায় ৫৭ জন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। ছাত্রশিবিরের বক্তব্য, সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ ছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভিত্তিতে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বাদ দেওয়া তাঁদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
ছাত্রশিবিরের ১৩ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি। দাবিগুলো হলো—
- জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন।
- নবম ও দশম গ্রেডের সরকারি চাকরির সব নিয়োগ পিএসসির অধীনে আনা এবং নিয়োগ, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
- কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন, দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার, প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতিসহ মোনেম কমিশনের সংস্কার উদ্যোগ বহাল রাখা।
- মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর অনুমোদিত শূন্য পদ, সম্ভাব্য অবসর, নতুন পদ সৃষ্টি এবং জনবলের চাহিদার তথ্য নির্ধারিত সময়ে পিএসসিকে সরবরাহ করা। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ।
- নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্নের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি ও বিলম্বের কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ।
- রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রতি বৈষম্য বন্ধ এবং এ ধরনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা চালু।
- সাধারণ সরকারি নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, মানদণ্ড, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ও সময়সীমা প্রকাশ।
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও প্রাসঙ্গিক অপরাধসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের সমন্বয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন এবং তা সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করা।
- ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং আপিল ও পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা রাখা।
- পদের ধরন ও দায়িত্ব অনুযায়ী লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর নির্ধারণ। মৌখিক পরীক্ষায় অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ।
- মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক নম্বর বা মূল্যায়নে অসংগতি দেখা গেলে তা পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা। এ জন্য ভাইভা পরীক্ষার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা।
- প্রশ্নফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা ও অন্যান্য অনিয়ম প্রতিরোধে নিরাপদ প্রযুক্তি, ডিজিটাল নজরদারি ও আধুনিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। পিএসসির প্রযুক্তিগত ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানো।
- সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৮, ১৯ ও ২০ ধারাসহ প্রাসঙ্গিক বিধান পর্যালোচনা করে নিয়োগ, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে মেধা, সততা, দক্ষতা ও কর্মসম্পাদনকে গুরুত্ব দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক সুমন সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান, ঢাকা কলেজ শাখার সভাপতি মোস্কাকিম আহমেদসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



























