একনেকে অনুমোদন নতুন ১১ ও সংশোধিত ২ প্রকল্প
৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ, ব্যয়ের চাপ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৬:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, জনসেবা সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে একসঙ্গে ১৩টি প্রকল্পে ৫৮ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত এসব প্রকল্পের মধ্যে নতুন ১১টি এবং সংশোধিত দুটি। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকেই আসবে ৫০ হাজার ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
একনেকের এই সিদ্ধান্তে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের বিনিয়োগের আগ্রহ স্পষ্ট হলেও অর্থায়নের কাঠামো নতুন করে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ, মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশই জোগান দিতে হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্প ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।
এতে একদিকে সরকারি অবকাঠামো ও জনসেবায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয়, বাজেটের ঘাটতি, ঋণ পরিশোধ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দক্ষতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত সময়ে সুফল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অবকাঠামো ও স্থানীয় সরকার খাতে বড় মনোযোগ
অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, খাল পুনঃখনন, জলবায়ু সহনশীল নগর উন্নয়ন এবং সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এসব প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট মোকাবিলা, নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা কমানো, খাল পুনরুদ্ধার এবং গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে বরিশালের খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প নগর ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও ভরাটের কারণে দেশের বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে খাল সংরক্ষণ ও পুনঃখনন কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নতি হতে পারে। তবে শুধু খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; খাল দখল বন্ধ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ ও সামরিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত ও পরিচালন যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোড আবাসিক এলাকায় বি-টাইপ কর্মকর্তাদের বাসস্থান নির্মাণ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে।
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও আবাসন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে শুধু নতুন গাড়ি সংগ্রহ নয়, সেগুলোর ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যয় এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপন করা হবে।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় নিউক্লিয়ার মেডিসিন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় এর গুরুত্ব রয়েছে। তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন পেয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় তিতাসে নতুন কূপ
জ্বালানি খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে একনেক সভায়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ—তিতাস-৩২ ও ৩৩ খননের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান রয়েছে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের সংকট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নতুন কূপ খননের পর প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে এবং তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে কত সময় লাগবে, সেটিই হবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা মূল্যায়নের প্রধান বিষয়।
সংশোধিত প্রকল্পে বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন
একনেকে অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে দুটি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে। এর একটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন। অন্যটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ সড়কে ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন।
একটি প্রকল্প বারবার সংশোধনের প্রয়োজন হলে এর কারণ, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা জরুরি। জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্প সংশোধন হতে পারে। তবে প্রতিটি সংশোধনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
কারণ, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়লে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়, অন্যদিকে জনগণ নির্ধারিত সময়ে সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
ছোট পাঁচ প্রকল্পেও গুরুত্ব পাচ্ছে নাগরিক সেবা
প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের অনুমোদনের বাইরে পরিকল্পনামন্ত্রী এরই মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। একনেক সভায় এসব প্রকল্প সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
প্রকল্পগুলো হলো দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হৃদরোগ চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন, শিশু-কিশোর ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রথম সংশোধন, ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আধুনিক যান ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ।
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, সাইবার নিরাপত্তা, নগর পরিবহন, মাদকাসক্তি নিরাময় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যয়ের চেয়ে বড় প্রশ্ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা
একনেকে ৫৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যাপকতা তুলে ধরলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের মান ও সময়ানুবর্তিতার ওপর। অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষ করে মোট ব্যয়ের বড় অংশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসায় অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্প অনুমোদনের সময় সম্ভাব্য সুফল, ব্যয়-সাশ্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি, অর্থ ছাড়, দরপত্র প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে।
সব মিলিয়ে, নতুন ১১টি ও সংশোধিত দুটি প্রকল্পে সরকারের বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও জননিরাপত্তা খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু বিপুল অর্থ বরাদ্দই উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। বরং সময়মতো প্রকল্প শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান সুফল পৌঁছে দেওয়াই হবে এই বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
























