অ্যাকাউন্ট থেকে ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ:ডাচ-বাংলার ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৫৩:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
ব্যাংকে আমানত রাখা অর্থও যে গ্রাহকের জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে, রাজধানীর শনিরআখড়ায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি শাখাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে সেই উদ্বেগ সামনে এসেছে। জমি ও গাড়ি বিক্রি, বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে পাওয়া সঞ্চয়ের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন গৃহিণী নারগিস আক্তার। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, নিরক্ষরতার সুযোগ নিয়ে চেক ও ব্যাংকিং নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে ওই হিসাব থেকে ৮৫ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের চার কর্মকর্তাসহ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালতে মামলার আবেদন করেন ভুক্তভোগী নারী। তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করে অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মামলার অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। তবে অভিযোগে যে ধরনের লেনদেন, নথি ব্যবহার ও অর্থ স্থানান্তরের বিবরণ উঠে এসেছে, তা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চেক বই থেকে অতিরিক্ত চেক নেওয়ার অভিযোগ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নারগিস আক্তার একজন নিরক্ষর গৃহিণী। জমি ও গাড়ি বিক্রির অর্থ এবং বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে সঞ্চিত মোট ১ কোটি ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৩১৯ টাকা তিনি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের দনিয়া শাখায় জমা রাখেন। লেখাপড়া না জানার কারণে ব্যাংকে চেক পূরণ ও টাকা জমা দেওয়ার কাজে কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিতেন তিনি।
এই নির্ভরতার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগই এখন মামলার মূল বিষয়।
বাদীর দাবি, গত ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকা তুলতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁর চেক বই থেকে একটি অতিরিক্ত চেক রেখে দেন। একই সঙ্গে ডিপিএস খোলার কথা বলে কয়েকটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
এরপর প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁর ব্যাংক হিসাব থেকে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
গত ৪ অক্টোবর ব্যাংকে গিয়ে হিসাবের স্থিতি জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হয়, অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৩৫ হাজার ২০৪ টাকা। অথচ তাঁর জমা করা অর্থের বড় অংশের কোনো হিসাব তিনি জানতেন না। বিষয়টি জানতে চাইলে ব্যাংক কর্মকর্তা মোহিত মোরশেদ তাঁকে জানান, ২৩ সেপ্টেম্বর ‘পজিটিভ পে ইনস্ট্রাকশন’ (Positive Pay Instruction) ফরমের মাধ্যমে একটি চেকের বিপরীতে গ্লোবাল গোল্ডেন জুট অ্যান্ড ক্রাফট লিমিটেডকে ৮৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
জাল স্বাক্ষরে ৮৫ লাখ টাকা স্থানান্তরের অভিযোগ
নারগিস আক্তারের অভিযোগ, ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যাংকে যাননি এবং গ্লোবাল গোল্ডেন জুট অ্যান্ড ক্রাফট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানকে কোনো চেকও দেননি। তাঁর দাবি, ১৭ সেপ্টেম্বর কর্মকর্তারা যে অতিরিক্ত চেকটি রেখে দিয়েছিলেন, সেটিতে পরবর্তী সময়ে জাল স্বাক্ষর ও টাকার অঙ্ক বসানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চেকের বিপরীতে পজিটিভ পে ইনস্ট্রাকশন ফরম তৈরি করে পূবালী ব্যাংক পিএলসির রাজবাড়ী শাখায় প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। পরে ২৮ সেপ্টেম্বর কোম্পানির পক্ষে আসামি শওকত হাসান পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে নগদ ৮৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন।
এখানে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি ব্যাংক হিসাব থেকে এত বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চেকের সত্যতা, স্বাক্ষর যাচাই, পজিটিভ পে নির্দেশনা এবং অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।
বিশেষ করে চেকের স্বাক্ষর প্রকৃত গ্রাহকের কি না, ফরমটি কে তৈরি করেছেন, ব্যাংকের কোন পর্যায়ে সেটি যাচাই করা হয়েছে এবং অর্থ ছাড়ের অনুমোদন কারা দিয়েছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
ব্যাংকের ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
পজিটিভ পে নির্দেশনা মূলত চেকের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রতিরোধের একটি যাচাইব্যবস্থা। এতে চেকের নম্বর, তারিখ, অর্থের পরিমাণ ও প্রাপকের তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। ফলে এই ব্যবস্থার আওতায় কোনো চেকের মাধ্যমে ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, চেকের স্বাক্ষর যাচাইয়ের সময় কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল? গ্রাহকের উপস্থিতি কিংবা সম্মতি নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না? একইভাবে পজিটিভ পে ফরমে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে চেকের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছিল কি না?
একটি ব্যাংক শাখায় গ্রাহকের চেক বই, স্বাক্ষর, হিসাবের তথ্য এবং লেনদেনের অনুমোদন—প্রতিটি পর্যায়ে নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা। এসব ব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে অনিয়ম হলে গ্রাহকের আমানত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ব্যাংক কর্মকর্তা ও কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আসামি
মামলায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের দনিয়া শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি ম্যানেজার মোহিত মোরশেদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার সৌরভ সাহা, রেমিট্যান্স অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মো. গোলাম কিবরিয়াকে আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্লোবাল গোল্ডেন জুট অ্যান্ড ক্রাফট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুব হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাকিম আলী সরদার, ম্যানেজার কাজী এনামুল কবির ও শওকত হাসান এবং প্রতিষ্ঠানটিকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাদীর দাবি, তিনি কোনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত গ্লোবাল গোল্ডেন জুট অ্যান্ড ক্রাফট লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে তাঁর অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ কাজে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
























