ঢাকা ০৬:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অ্যাকাউন্ট থেকে ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ:ডাচ-বাংলার ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিতে অপেক্ষা ১০ বছর, কঠোর হচ্ছে অভিবাসন নীতি ৭ নভেম্বর উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী মহেশপুর সীমান্তের ধানক্ষেতে নারীর মরদেহ, পরিচয় মিলেছে যশোরে কাঁঠালিয়ায় অবৈধ ইটভাটার ১২০ ফুট চিমনি গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন যশোরে শিশু-কিশোরদের ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ, ব্যয়ের চাপ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এনআইডি সংশোধনের আড়ালে সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার জালিয়াতি নারী ক্রিকেটারকে যৌন হয়রানির প্রমাণ পেয়েছে বিসিবি মামলায় হাজির না হওয়ায় পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিতে অপেক্ষা ১০ বছর, কঠোর হচ্ছে অভিবাসন নীতি

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:২৭:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের স্থায়ী হওয়ার পথ আরও কঠিন করছে দেশটির সরকার। এতদিন অধিকাংশ বৈধ অভিবাসী পাঁচ বছর বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) পাওয়ার আবেদন করতে পারতেন। নতুন অভিবাসন নীতিতে সেই সময় দ্বিগুণ করে ১০ বছর করা হয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস করলেই নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী হওয়ার সুযোগ মিলবে না; বরং আয়, পেশাগত দক্ষতা, সরকারি অর্থনীতিতে অবদান এবং অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত পালনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা।

সোমবার (২ নভেম্বর) পার্লামেন্টে নতুন নীতি ঘোষণা করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। সরকারের এই সিদ্ধান্তে উচ্চ আয়ের দক্ষ অভিবাসীদের জন্য তুলনামূলক দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ রাখা হলেও সাধারণ কর্মজীবী ও অন্যান্য বৈধ অভিবাসীদের অপেক্ষার সময় বাড়ানো হয়েছে।

নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্থায়ী বসবাসের অনুমতিকে আর শুধু নির্দিষ্ট সময়ের বৈধ বসবাসের ফল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। বরং একজন অভিবাসী যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে কতটা অবদান রাখছেন, তাঁর আয় কত এবং তিনি অভিবাসনের শর্ত যথাযথভাবে মেনে চলছেন কি না—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে স্থায়ী হওয়ার সময়

নতুন নীতিতে অভিবাসীদের জন্য কয়েকটি পৃথক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করেন, এমন উচ্চ দক্ষ অভিবাসীরা মাত্র তিন বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদনের সুযোগ পাবেন।

অন্যদিকে বছরে ৫০ হাজার ২৭১ পাউন্ডের বেশি আয় করা কর্মী এবং চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষার নিয়ম রাখা হয়েছে। তবে সাধারণ বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সময় হবে ১০ বছর।

এতে স্পষ্ট, ব্রিটিশ সরকার অভিবাসন ব্যবস্থায় আয় ও পেশাগত অবদানকে বড় মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিপরীতে তুলনামূলক কম আয়ের কর্মীদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

তবে এই নীতির ফলে একই দেশে বৈধভাবে বসবাস করলেও অভিবাসীদের মধ্যে স্থায়ী হওয়ার সুযোগে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবার নিয়ে বসবাস এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

কেয়ার কর্মীদের জন্য থাকছে বিশেষ ছাড়

নতুন নীতিতে কিছু অভিবাসীর জন্য পুরোনো নিয়ম বহাল রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের আগে কেয়ার বা সমাজসেবা কর্মী হিসেবে ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়া ব্যক্তিরা আগের নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন।

তবে এ ক্ষেত্রে তাঁদের ভিসার শর্ত মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি আবেদনের আগের ১২ মাসে বার্ষিক আয় কমপক্ষে ২৫ হাজার পাউন্ড হতে হবে।

এই ছাড়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কেয়ার খাতে কর্মরত অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের ক্ষেত্রে পুরোনো নিয়ম বহাল রাখার মাধ্যমে সরকার একদিকে এই খাতের কর্মীদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আয় ও কর্মসংস্থানের শর্তের মাধ্যমে স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।

অনিয়মে স্থায়ী হওয়ার অপেক্ষা ৩০ বছর পর্যন্ত

নতুন নীতির সবচেয়ে কঠোর অংশ রয়েছে অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত ভঙ্গকারীদের ক্ষেত্রে। ভিসার শর্ত অমান্য করলে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ভাতা গ্রহণ করলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষা বেড়ে ২০ বছর হতে পারে।

অন্যদিকে ছোট নৌকায় অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই সময় ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।

এর মাধ্যমে সরকার বৈধ অভিবাসন ও অবৈধ প্রবেশের মধ্যে আরও কঠোর পার্থক্য তৈরি করতে চাইছে। একই সঙ্গে সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভিবাসীদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অবদান বাড়াতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তবে দীর্ঘ সময় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পাওয়ার অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন ভিসার শর্ত ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হবে। এতে তাঁদের কর্মজীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

করদাতাদের অর্থ সাশ্রয়ের যুক্তি সরকারের

ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। বরং যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী একজন অভিবাসীকে তাঁর যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে এই অধিকার অর্জন করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের বক্তব্য, বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে হলে করদাতাদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতে পারে। তাই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান ও স্বনির্ভরতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারের এই অবস্থানের পেছনে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের চাপ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে। বিশেষ করে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অভিবাসীদের ওপর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিষয়টি যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

তবে অভিবাসীরা শুধু সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন না; তাঁরা কর দেন, বিভিন্ন খাতে শ্রম দেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। ফলে অভিবাসীদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনা না করে শুধু সরকারি ব্যয়ের যুক্তিতে নীতি নির্ধারণ করলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন অভিবাসন নীতি

নতুন নীতি ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর কেউ কেউ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে লেবার পার্টির ভেতরেও নীতির কিছু দিক নিয়ে আপত্তি রয়েছে।

বিশেষ করে বৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের স্থায়ী হওয়ার সময় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে কাজ ও কর প্রদান করেও স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা না পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশার কর্মীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের সময়সীমা রাখা হলেও অন্য পেশার কর্মীদের ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ফলে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখার সরকারি লক্ষ্য এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কঠোর অবস্থানের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস ও কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী, দক্ষ পেশাজীবী, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশার কর্মী রয়েছেন। নতুন নীতির ফলে তাঁদের সবার ওপর একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। বরং ভিসার ধরন, পেশা, আয় এবং যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সময়ের ওপর নির্ভর করবে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ।

বিশেষ করে সাধারণ কর্মজীবী ও তুলনামূলক কম আয়ের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর অপেক্ষার শর্ত দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে নির্ধারিত আয় ও যোগ্যতা পূরণ করতে পারলে উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যেই আবেদনের সুযোগ পাবেন।

যাঁরা যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা পরিবার নিয়ে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য নতুন নীতির শর্তগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের ভিসার বৈধতা ও অন্যান্য অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের নতুন অভিবাসন নীতি শুধু স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশটির অভিবাসন দর্শনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। যেখানে বৈধভাবে বসবাসের সময়ের পাশাপাশি আয়, পেশাগত দক্ষতা ও অর্থনৈতিক অবদানকে স্থায়ী হওয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের চাপ কমবে এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখা অভিবাসীরা অগ্রাধিকার পাবেন। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা ও কঠোর শর্তের কারণে বৈধ অভিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়লে যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখার লক্ষ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিতে অপেক্ষা ১০ বছর, কঠোর হচ্ছে অভিবাসন নীতি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:২৭:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের স্থায়ী হওয়ার পথ আরও কঠিন করছে দেশটির সরকার। এতদিন অধিকাংশ বৈধ অভিবাসী পাঁচ বছর বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) পাওয়ার আবেদন করতে পারতেন। নতুন অভিবাসন নীতিতে সেই সময় দ্বিগুণ করে ১০ বছর করা হয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস করলেই নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী হওয়ার সুযোগ মিলবে না; বরং আয়, পেশাগত দক্ষতা, সরকারি অর্থনীতিতে অবদান এবং অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত পালনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা।

সোমবার (২ নভেম্বর) পার্লামেন্টে নতুন নীতি ঘোষণা করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। সরকারের এই সিদ্ধান্তে উচ্চ আয়ের দক্ষ অভিবাসীদের জন্য তুলনামূলক দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ রাখা হলেও সাধারণ কর্মজীবী ও অন্যান্য বৈধ অভিবাসীদের অপেক্ষার সময় বাড়ানো হয়েছে।

নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্থায়ী বসবাসের অনুমতিকে আর শুধু নির্দিষ্ট সময়ের বৈধ বসবাসের ফল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। বরং একজন অভিবাসী যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে কতটা অবদান রাখছেন, তাঁর আয় কত এবং তিনি অভিবাসনের শর্ত যথাযথভাবে মেনে চলছেন কি না—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে স্থায়ী হওয়ার সময়

নতুন নীতিতে অভিবাসীদের জন্য কয়েকটি পৃথক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করেন, এমন উচ্চ দক্ষ অভিবাসীরা মাত্র তিন বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদনের সুযোগ পাবেন।

অন্যদিকে বছরে ৫০ হাজার ২৭১ পাউন্ডের বেশি আয় করা কর্মী এবং চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষার নিয়ম রাখা হয়েছে। তবে সাধারণ বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সময় হবে ১০ বছর।

এতে স্পষ্ট, ব্রিটিশ সরকার অভিবাসন ব্যবস্থায় আয় ও পেশাগত অবদানকে বড় মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিপরীতে তুলনামূলক কম আয়ের কর্মীদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

তবে এই নীতির ফলে একই দেশে বৈধভাবে বসবাস করলেও অভিবাসীদের মধ্যে স্থায়ী হওয়ার সুযোগে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবার নিয়ে বসবাস এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

কেয়ার কর্মীদের জন্য থাকছে বিশেষ ছাড়

নতুন নীতিতে কিছু অভিবাসীর জন্য পুরোনো নিয়ম বহাল রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের আগে কেয়ার বা সমাজসেবা কর্মী হিসেবে ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়া ব্যক্তিরা আগের নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন।

তবে এ ক্ষেত্রে তাঁদের ভিসার শর্ত মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি আবেদনের আগের ১২ মাসে বার্ষিক আয় কমপক্ষে ২৫ হাজার পাউন্ড হতে হবে।

এই ছাড়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কেয়ার খাতে কর্মরত অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের ক্ষেত্রে পুরোনো নিয়ম বহাল রাখার মাধ্যমে সরকার একদিকে এই খাতের কর্মীদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আয় ও কর্মসংস্থানের শর্তের মাধ্যমে স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।

অনিয়মে স্থায়ী হওয়ার অপেক্ষা ৩০ বছর পর্যন্ত

নতুন নীতির সবচেয়ে কঠোর অংশ রয়েছে অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত ভঙ্গকারীদের ক্ষেত্রে। ভিসার শর্ত অমান্য করলে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ভাতা গ্রহণ করলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষা বেড়ে ২০ বছর হতে পারে।

অন্যদিকে ছোট নৌকায় অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই সময় ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।

এর মাধ্যমে সরকার বৈধ অভিবাসন ও অবৈধ প্রবেশের মধ্যে আরও কঠোর পার্থক্য তৈরি করতে চাইছে। একই সঙ্গে সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভিবাসীদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অবদান বাড়াতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তবে দীর্ঘ সময় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পাওয়ার অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন ভিসার শর্ত ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হবে। এতে তাঁদের কর্মজীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

করদাতাদের অর্থ সাশ্রয়ের যুক্তি সরকারের

ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। বরং যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী একজন অভিবাসীকে তাঁর যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে এই অধিকার অর্জন করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের বক্তব্য, বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে হলে করদাতাদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতে পারে। তাই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান ও স্বনির্ভরতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারের এই অবস্থানের পেছনে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের চাপ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে। বিশেষ করে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অভিবাসীদের ওপর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিষয়টি যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

তবে অভিবাসীরা শুধু সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন না; তাঁরা কর দেন, বিভিন্ন খাতে শ্রম দেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। ফলে অভিবাসীদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনা না করে শুধু সরকারি ব্যয়ের যুক্তিতে নীতি নির্ধারণ করলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন অভিবাসন নীতি

নতুন নীতি ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর কেউ কেউ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে লেবার পার্টির ভেতরেও নীতির কিছু দিক নিয়ে আপত্তি রয়েছে।

বিশেষ করে বৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের স্থায়ী হওয়ার সময় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে কাজ ও কর প্রদান করেও স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা না পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশার কর্মীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের সময়সীমা রাখা হলেও অন্য পেশার কর্মীদের ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ফলে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখার সরকারি লক্ষ্য এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কঠোর অবস্থানের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস ও কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী, দক্ষ পেশাজীবী, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশার কর্মী রয়েছেন। নতুন নীতির ফলে তাঁদের সবার ওপর একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। বরং ভিসার ধরন, পেশা, আয় এবং যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সময়ের ওপর নির্ভর করবে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ।

বিশেষ করে সাধারণ কর্মজীবী ও তুলনামূলক কম আয়ের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর অপেক্ষার শর্ত দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে নির্ধারিত আয় ও যোগ্যতা পূরণ করতে পারলে উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যেই আবেদনের সুযোগ পাবেন।

যাঁরা যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা পরিবার নিয়ে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য নতুন নীতির শর্তগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের ভিসার বৈধতা ও অন্যান্য অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের নতুন অভিবাসন নীতি শুধু স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশটির অভিবাসন দর্শনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। যেখানে বৈধভাবে বসবাসের সময়ের পাশাপাশি আয়, পেশাগত দক্ষতা ও অর্থনৈতিক অবদানকে স্থায়ী হওয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের চাপ কমবে এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখা অভিবাসীরা অগ্রাধিকার পাবেন। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা ও কঠোর শর্তের কারণে বৈধ অভিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়লে যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখার লক্ষ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।