২৭ দিনে ৫ খুন, সিলেটে বাড়ছে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৯:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে নগরে পাঁচজন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক ব্যবসায়ী, তাঁর স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকা—মোট তিনজন।
গত ২৭ জুলাই থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন। রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে নগরের ইসলামাবাদ এলাকায় বাড়ির কাছেই দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিনি নিহত হন।
এর আগে গত ২৭ জুলাই কাজিরবাজার সেতুর ওপর ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় কিশোর রিফাত আহমদ। আর ১২ আগস্ট রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় খুন হন ব্যবসায়ী ও সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা।
বাড়ি ফেরার পথেই কুপিয়ে হত্যা
রোববার রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ইসলামাবাদ এলাকায় শাহাবুদ্দিনকে কুপিয়ে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে স্বজন ও স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত শাহাবুদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই এলাকার বিজয় বাড়ির বাসিন্দা। ২০২০ সালের দিকে পরিবার নিয়ে শাহপরান ইসলামাবাদ এলাকায় বসবাস শুরু করেন। শাহপরানের (রহ.) মাজারের প্রধান ফটকের পাশে তাঁর একটি দোকান রয়েছে।
স্বজনেরা জানান, রাতে দোকান থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন শাহাবুদ্দিন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ফেলে যায়। তাঁর ঘাড় ও গলায় একাধিক কোপের চিহ্ন পাওয়া যায়।
নিহতের ছোট ছেলে রেদওয়ান আহমদ বলেন, রাতে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে জানান, তাঁর বাবাকে কেউ আটকে রেখেছে। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে বাবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।
শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না দাবি করে তাঁর ভাতিজা আলামিন জুয়েল বলেন, তিনি প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের দোকানে হেঁটে যাতায়াত করতেন। ঘটনাটি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ঘটেছে বলেও তাঁরা মনে করছেন না। কারণ, তাঁর সঙ্গে থাকা আইফোন ও প্রায় ১০ হাজার টাকা অক্ষত ছিল।
আগে প্রাণ গেছে আরও চারজনের
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের শুরু ২৭ জুলাই রাতে। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে নগরের কাজিরবাজার সেতুর ওপর ছুরিকাঘাতে নিহত হয় কিশোর রিফাত আহমদ। ঘটনার ২৫ দিন পর ২১ আগস্ট মামলার অভিযুক্ত জুয়েল আহমদকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর ১২ আগস্ট রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় ঘটে চাঞ্চল্যকর তিন খুনের ঘটনা। ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা নিহত হন।
এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, চুরির উদ্দেশ্যে বাসায় ঢুকে প্রথমে গৃহপরিচারিকাকে দেখতে পান তিনি। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে দম্পতিকেও হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
মাদক, কিশোর গ্যাং ও অনলাইন জুয়া নিয়ে উদ্বেগ
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি নগরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত শনিবার (২২ আগস্ট) সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে মতবিনিময় করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি সিলেট মহানগরের সংসদ সদস্যও।
সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিলেটে মাদকের আনাগোনা, অনলাইন জুয়া কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখতে চান না।
নজরদারি বাড়ানোর কথা পুলিশের
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম বলেন, নগরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল, মোবাইল টিম পরিচালনা এবং অপরাধীদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ব্যবসায়িক বা জমিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ থাকলে নিজেরা সংঘাতে না জড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে নাগরিকদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটছে না। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরীন আক্তারের মতে, অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ড বাড়তে থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।




















