রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর
ফেরার অপেক্ষায় প্রজন্ম, অনিশ্চয়তায় ১২ লাখ জীবন

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
“নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই”—৮৬ বছরের আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে এই আকুতি শুধু একজন বৃদ্ধের নয়, যেন নয় বছর ধরে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে আটকে থাকা লাখো রোহিঙ্গার সম্মিলিত প্রত্যাশা।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টুডেং জব্বারপাড়া গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা-দাদা-পরদাদার বসতি ছিল সেখানে। জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে। অসংখ্য শিশুকে পড়িয়েছেন, স্থানীয় সমাজে ছিল তাঁর পরিচিতি ও সম্মান। অথচ সেই জন্মভূমিতেই একসময় তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে অনিশ্চিত।
নাগরিকত্ব সংকট, জাতিগত বৈষম্য, চলাচলে বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে একপর্যায়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয় সীমান্ত। আজ কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—জীবনের শেষ সময়ে একবার নিজের মাটিতে ফিরে যাওয়া।
আব্দুল জব্বারের এই গল্প বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ রাষ্ট্রহীনতা, অধিকার হারানো, উচ্ছেদ এবং ঘরে ফেরার অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সেই ভয়াবহ ঢল বিশ্ববাসীর নজর কাড়লেও রোহিঙ্গা সংকটের শুরু তার বহু আগে। ১৯৭৮, ১৯৯০-এর দশক, ২০১২, ২০১৬—বারবার সহিংসতা ও সামরিক অভিযানে রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
নয় বছর পরও সেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বরং কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শিবিরগুলোতে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম। তাদের অনেকের জন্ম বাংলাদেশে। মিয়ানমারের মাটিতে কখনো পা না রেখেও তারা জানে, তাদের একটি জন্মভূমি আছে। বাবা-মায়ের মুখে শোনা গ্রামের নাম, ফেলে আসা বাড়ির গল্প আর পুরোনো স্মৃতির মধ্য দিয়েই তারা সেই দেশকে চিনছে।
অধিকার সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস
রোহিঙ্গাদের বর্তমান সংকটকে শুধু ২০১৭ সালের ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর গভীরতা বোঝা যায় না।
১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ অভিযানের সময় ব্যাপক ধরপাকড় ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সে সময় আনুমানিক দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরে দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে তাঁদের বড় একটি অংশ মিয়ানমারে ফিরে যায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল জব্বারও।
কিন্তু দেশে ফিরে আগের জীবন আর ফিরে পাননি তাঁরা।
আব্দুল জব্বারের ভাষায়, “চুক্তি অনুযায়ী অধিকার দেওয়া হয়নি। উল্টো কয়েক বছর পর সব কিছু কেড়ে নেওয়া হয়।”
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। নাগরিকত্বের কাঠামো থেকে রোহিঙ্গারা ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়েন। পরিচয়পত্র, চলাচল, শিক্ষা, চাকরি, বিয়ে ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তে থাকে বিধিনিষেধ।
আব্দুল জব্বারের প্রশ্ন, “যেখানে আমি জন্মেছি, যেখানে আমার পূর্বপুরুষরা বসবাস করেছে, সেখানে আমাকে কেন বাঙালি বলা হবে? আমি রোহিঙ্গা।”
এই প্রশ্নের মধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের অন্যতম মূল দ্বন্দ্ব—পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নটি আটকে আছে।
নয় বছরে বদলে গেছে প্রজন্ম
২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ। ভাসানচরে রয়েছে আরও প্রায় ৩৪ হাজার।
অর্থাৎ ২০১৭ সালে যেসব শিশু বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের অনেকে এখন কিশোর বা তরুণ। আর ২০১৭ সালের পর জন্ম নেওয়া একটি বড় অংশের রোহিঙ্গা কখনো মিয়ানমার দেখেনি।
তাদের কাছে রাখাইন একটি বাস্তব ভূখণ্ডের চেয়ে অনেকটা গল্পের মতো। বাবার মুখে শোনা গ্রামের নাম, মায়ের কাছে শোনা বাড়ির স্মৃতি কিংবা পুরোনো কোনো ছবির মধ্যেই তাদের জন্মভূমি।
তবুও তারা জানে—তাদের একটি দেশ আছে।
সেই দেশের নাম মিয়ানমার। কিন্তু সেই দেশের নাগরিকত্ব নেই।
দুই দফা উদ্যোগ, ফেরেনি কেউ
২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নিশ্চয়তা না পাওয়ায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি হননি।
২০১৯ সালের ২২ ও ২৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায়ও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এরপর কেটে গেছে আরও কয়েক বছর। তালিকা হয়েছে, তথ্য যাচাই হয়েছে, বৈঠক হয়েছে, কূটনৈতিক তৎপরতা চলেছে। কিন্তু টেকসইভাবে একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ ভূমিতে ফেরানো সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বদলে গেছে।
রাখাইনে নতুন সংঘাত
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। রাখাইনও সেই সংঘাতের বাইরে নেই।
আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর লড়াইয়ে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বদলেছে। তৈরি হয়েছে নতুন নিরাপত্তা সংকট।
ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি এখন শুধু মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নেবে কি না—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কোথায় ফিরবে, কার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ফিরবে এবং সেখানে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার কে নিশ্চিত করবে?
জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ সালের রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনাতেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হিসেবে রাখা হয়েছে। একই সময়ে মানবিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণও বিপুল।
যাচাই এগোলেও ফেরার পথ বন্ধ
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাই।
বাংলাদেশ কয়েক ধাপে মিয়ানমারের কাছে আট লাখের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য দিয়েছে। মিয়ানমারও ধাপে ধাপে এসব তথ্য যাচাই করছে। সাম্প্রতিক হিসাবে কয়েক লাখ ব্যক্তিকে যাচাই করা হয়েছে এবং তাঁদের একটি বড় অংশকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন।
তথ্য যাচাই শেষ হলেই কি প্রত্যাবাসন শুরু হবে?
বাস্তবতা বলছে, এখনো না।
সংঘাতপূর্ণ রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়—এমন অবস্থানই মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে। ফলে যাচাইয়ের সংখ্যা বাড়লেও মানুষের ফেরার দিন নির্ধারিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের ওপরও বাড়ছে চাপ
রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু শিবিরের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই।
উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ, বন ও পাহাড়, পানি ও স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি, শ্রমবাজার—সবকিছুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক, মানবপাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও অপরাধী চক্রের তৎপরতা। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ক্রমে জটিল হচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থের প্রয়োজনও বাড়ছে। সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, এর ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও তত বাড়ছে।
সমাধান কোথায়?
রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশে রেখে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আবার নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে তাঁদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোও টেকসই পথ হতে পারে না।
সমাধানের মূল জায়গা তাই মিয়ানমারেই।
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা ও চলাচলের অধিকার। ফিরিয়ে দিতে হবে বসতভিটা ও ভূমির অধিকার। বন্ধ করতে হবে জাতিগত বৈষম্য। পাশাপাশি অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “আগেও দুই দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের পরিস্থিতি আরও জটিল। শুধু মিয়ানমার সরকার রাজি হলেই হবে না, সেখানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ভাষ্য, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বর্তমানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। জন্মহার কিছুটা কমলেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও মনে করেন, সংকটের সমাধান অনেকাংশে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ ও মিয়ানমারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তাঁর মতে, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংলাপ প্রয়োজন।
তবে শিবিরে বসে আব্দুল জব্বারের কাছে এসব কূটনৈতিক হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে আছে একটি সাধারণ প্রশ্ন—
“আমি কি জীবিত থাকতে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারব?”
নয় বছর ধরে যার উত্তর মেলেনি। আর সময় যত গড়াচ্ছে, সেই প্রশ্নটি শুধু আব্দুল জব্বারের নয়—হয়ে উঠছে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।



















