সৌদিতে হুথি হামলায় নিরাপত্তা সংকট, বাঙ্কার-সুরক্ষিত প্রাসাদে যুবরাজ!

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫৪:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর বন্ধ রাখা হয়েছে বিমানবন্দরটি। বাতিল হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উড়ান। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের খবরও সামনে এসেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, ৪১ বছর বয়সী যুবরাজকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর নিরাপত্তা ও অবস্থান নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে হামলার জেরে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় ভারতের একাধিক বিমান সংস্থা সৌদিগামী ও সৌদি থেকে ছেড়ে যাওয়া উড়ান স্থগিত করেছে। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি প্রবাসীদের ভ্রমণ পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
রিয়াদসহ সৌদির বিভিন্ন শহরে উড়ান বাতিল
সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে ভারতের বিমান সংস্থাগুলো উড়ান চলাচলে বিধিনিষেধ বাড়িয়েছে। ইন্ডিগো জানিয়েছে, রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনাগামী এবং এসব শহর থেকে ছেড়ে যাওয়া তাদের উড়ান ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল থাকবে।
আকাশ এয়ারও রিয়াদ ও জেদ্দার উড়ান স্থগিত রাখার সময়সীমা বাড়িয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া ও এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসও সৌদির বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের টিকিটের অর্থ ফেরত কিংবা বিনা খরচে ভ্রমণের তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
বিমানবন্দরে হামলায় হতাহত শতাধিক
গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে হামলায় অন্তত ১২ থেকে ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
হামলার পর বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন রোববার সেখানে আরেকটি হামলায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত পাঁচ দিনে বিমানবন্দরটিতে চারবার হামলার খবর পাওয়া গেছে। হুথি বিদ্রোহীরা হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম নিরাপদ করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ সেটি বন্ধ রাখার সময়সীমা বাড়িয়েছে।
উড়ান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিরিয়ামের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর সৌদি আরবের বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিমান নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও ওই অঞ্চলে উড়ান পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত সরকার বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি, বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা
হুথিদের হামলার জবাবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে আসছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ঘাটতি মোকাবিলায় রিয়াদ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিশরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলেও খবরে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব দেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংঘাতের পেছনে ইয়েমেন যুদ্ধ
সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে বিরোধের শিকড় ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরাসরি হস্তক্ষেপ করার পর দুই পক্ষের সংঘাত তীব্র হয়। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক হয়নি।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির পর সৌদি আরবের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংঘাত কমানোর উদ্যোগ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও সংঘাতের কারণে আরব উপদ্বীপে অস্থিতিশীলতা বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সৌদিতে আটকে পড়া ভারতীয়দের জন্য দূতাবাসের সহায়তা
উড়ান বাতিল হওয়ায় সৌদি আরবে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তায় রিয়াদে ভারতীয় দূতাবাস ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করেছে বলে দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আহত ভারতীয় নাগরিকদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও দূতাবাস কাজ করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উড়ান বাতিলের কারণে যেসব ভারতীয় নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের দেশে ফেরা পর্যন্ত জরিমানা না করার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ধারাবাহিক হামলা, উড়ান চলাচলে বিঘ্ন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া, হুথিদের সামরিক তৎপরতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।



























