রাতে মহাসড়কে সিএনজি চালায় কারা? পরিচয়হীন চালক, ঝুঁকিতে যাত্রী

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩৮:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে রাতের যাত্রা অনেকের জন্য এখন উদ্বেগের কারণ। দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে বাড়ি ফিরতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাই ভরসা। অথচ এসব অটোরিকশার চালক কে, গাড়ির মালিক কে, বৈধ কাগজপত্র আছে কি না—তার নির্ভরযোগ্য তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। যাত্রী পরিবহনের এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্র। ছিনতাই থেকে শুরু করে ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
কুমিল্লায় সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বুলেট বৈরাগী, অন্যটিতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজনিম। দুটি ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য।
প্রশ্ন উঠেছে, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী ওঠানামার স্থানগুলোতে রাতের বেলায় কারা অটোরিকশা চালাচ্ছেন? তাঁদের পরিচয় ও যানবাহনের তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা কতটা আছে? আর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ও চালকদের শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কোথায়?
বাস থেকে নেমে অটোরিকশায়, তারপর মৃত্যু
চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন বুলেট বৈরাগী। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর, ২৫ এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ। মরদেহে ছিল একাধিক আঘাতের চিহ্ন।
ঘটনার রাতে কুমিল্লায় বাস থেকে জাগুরঝুলি এলাকায় নামেন বুলেট। অভিযোগ অনুযায়ী, আগে থেকেই ওত পেতে থাকা একটি ছিনতাইকারী চক্র তাঁকে লক্ষ্য করে। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মারধর ও ছিনতাইয়ের পর চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয় তাঁকে। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
সে সময় র্যাব জানায়, হত্যাকাণ্ডে পাঁচ সদস্যের একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র জড়িত ছিল। যাত্রী সেজে ফাঁদ পেতে তারা বুলেটকে অটোরিকশায় তোলে বলে অভিযোগ ওঠে।
এর প্রায় ছয় মাস পর, গত ৮ অক্টোবর, একই ধরনের পরিবহননির্ভর অপরাধের আরও ভয়াবহ অভিযোগ সামনে আসে। কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে পদুয়ার বাজার এলাকায় বাস থেকে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফিরছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজনিম। পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় সে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শহরে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশাচালক তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর পর লালমাই এলাকার জগতপুরে একটি ধানক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর জবানবন্দিতেও ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
দুটি ঘটনাতেই সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসায় রাতের যাত্রী পরিবহনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চালক-মালিকের তথ্য নেই, নিয়ন্ত্রণের বাইরে বহু অটোরিকশা
কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলায় যাত্রী ওঠানামা নিয়মিত ঘটনা। দীর্ঘ এই মহাসড়কের ১০০ কিলোমিটারের বেশি অংশ কুমিল্লা জেলার মধ্যে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসে আসা যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে স্থানীয় যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। রাতের বেলায় গণপরিবহনের সংকট থাকায় অনেকের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাই একমাত্র ভরসা।
কিন্তু এসব অটোরিকশার বড় একটি অংশের কাগজপত্র ও চালকের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় চালকদের ভাষ্য, মহাসড়ক ও সংযোগ সড়কে চলাচলকারী অনেক অটোরিকশার বৈধ কাগজপত্র নেই। আবার কোনো কোনো গাড়ি চালান অস্থায়ী বা বদলি চালক। তাঁদের পরিচয় ও নিয়োগের তথ্য সংরক্ষিত না থাকায় অপরাধের পর চালককে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পদুয়ার বাজার থেকে ময়নামতি সেনানিবাস পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি স্থানে রাতের বেলায় যাত্রী ওঠানামা করতে দেখা যায়। পদুয়ার বাজার, কোটবাড়ি বিশ্বরোড, জাগুরঝুলি, আলেখারচর ও ময়নামতি সেনানিবাস এলাকায় রাতের বেলায় যাত্রী পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করে অন্তত ২০০ সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এসব স্থানে গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে যাত্রীরা অনেক সময় অপরিচিত চালকের গাড়িতে উঠতে বাধ্য হন।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু গাড়ি মালিক নিজে চালান, আবার কিছু গাড়ি ভাড়ায় চালানো হয়। পাশাপাশি অন্য উপজেলা বা জেলা থেকে আসা চালকেরাও এসব এলাকায় যাত্রী পরিবহন করেন। তাঁদের মধ্যে কে নিয়মিত চালক, আর কে অস্থায়ীভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন—তা সব সময় যাচাই করা সম্ভব হয় না।
পদুয়ার বাজারের হোটেল নূর জাহানের সামনে কথা হয় স্থানীয় অটোরিকশাচালক আবদুর রহিমের সঙ্গে। ৩০ বছর ধরে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “দিনে যারা চালায়, তাদের মোটামুটি সবাইকে চিনি। কারও নিজের সিএনজি, কেউ ভাড়ায় চালায়। আর কাগজ না থাকলে কে ড্রাইভার, কে ঠ্যাকবাজ—কীভাবে চিনব?”
আরেক চালক হুমায়ুন কবির বলেন, “আমরা শুনি, খুন বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব সিএনজি ড্রাইভাররা করে। এখন একজন-দুজনের জন্য সবার দোষ হয়। আমরাও চাই লাইসেন্স হোক, ড্রাইভারের পরিচয় দিয়ে চলুক।”
পরিচিত অটোরিকশা ছাড়া রাতে চলাচলে ভয়
অপরাধের আশঙ্কায় রাতের যাতায়াতের অভ্যাস বদলে ফেলেছেন অনেক যাত্রী। পদুয়ার বাজার এলাকায় কথা হয় কুমিল্লা শহরের ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তাঁকে প্রায়ই রাতে যাতায়াত করতে হয়। আগে বাস থেকে নেমে অটোরিকশায় বাড়ি ফিরতে ভয় লাগত না। এখন পরিচিত অটোরিকশা শহর থেকে আনিয়ে নেন। অপরিচিত গাড়িতে উঠতে চান না।
কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, পদুয়ার বাজার এলাকায় ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের তৎপরতা বেশি বলে তাঁদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে। এসব অপরাধে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন ব্যবহার করা হয়। তাঁর মতে, অপরাধের সঙ্গে একাধিক চক্র জড়িত থাকতে পারে। কেউ কেউ অন্য এলাকা থেকে এসে অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, যানবাহন নিবন্ধিত না হলে কিংবা নিয়মিত চেকপোস্ট ও তল্লাশি না থাকলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলায় নিবন্ধিত ২২ হাজারের বেশি সিএনজি
কুমিল্লা বিআরটিএ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ২২ হাজার ২৪৭টি। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, জেলায় সব মিলিয়ে এ ধরনের অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার হতে পারে।
কতজন চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, নিবন্ধিত অটোরিকশাগুলোর কতগুলো পরিবহন সংগঠনের আওতায় রয়েছে কিংবা কতজন চালকের পরিচয় সংরক্ষিত আছে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কুমিল্লা বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আলম বলেন, অটোরিকশার মালিকদের জন্য চালক নিয়োগের নির্দিষ্ট বিধি বা প্রক্রিয়া চালুর নির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে কোনো অটোরিকশায় অপরাধ সংঘটিত হলে মালিককেও আইনের আওতায় আনার সুযোগ থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশের এলাকার বাসিন্দা ও সংবাদকর্মী আবু মুসা বলেন, নিবন্ধনহীন অটোরিকশা কিংবা লাইসেন্সবিহীন চালকের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে বিআরটিএ বা হাইওয়ে পুলিশ কেউই দায় এড়াতে পারে না। তাঁর মতে, অপরাধের পর গাড়ি ও চালক খোঁজার চেয়ে আগে থেকেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জনবল সংকটে টহল ও নজরদারি
মহাসড়কে অপরাধ প্রতিরোধে জনবল ও যানবাহনের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশও। হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তিমান চাকমা বলেন, তাঁদের হাতে থাকা জনবল ও যানবাহন দিয়ে পর্যাপ্ত চেকপোস্ট স্থাপন এবং নিয়মিত টহল পরিচালনা করা কঠিন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় এলেও কুমিল্লা-নোয়াখালী ও কুমিল্লা-চাঁদপুর মহাসড়ক এখনো সেই আওতায় আসেনি।
তিনি আরও বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনার দায়িত্ব বিআরটিএর। সংস্থাটি অভিযান চালালে হাইওয়ে পুলিশ সহযোগিতা করবে। নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স না থাকলে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা যেতে পারে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজনিমের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের অপরাধপ্রবণতা নিয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, বিষয়টি হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তাই এ নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে চান না। তবে জেলা পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে বলে জানান তিনি।
এক মাসে ১৬ খুনের মামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
কুমিল্লায় সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। রোববার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির কার্যবিবরণী অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও চালকদের তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী বলেন, দ্রুত অটোরিকশা ও চালকদের তথ্যভান্ডারের আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে। প্রতিটি অটোরিকশায় মালিক ও চালকের পরিচয়সংবলিত কার্ড রাখতে হবে। এ বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরামর্শ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় নেওয়া হয়েছে।
তবে কেবল উদ্যোগ ঘোষণা করলেই রাতের যাত্রায় নিরাপত্তা ফিরবে না। অটোরিকশার নিবন্ধন যাচাই, চালকের পরিচয় নিশ্চিত করা, মালিকের তথ্য সংরক্ষণ, নিয়মিত তল্লাশি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি—সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন জরুরি। নইলে বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরার সহজ বাহনটি অপরাধীদের হাতে যাত্রীদের জন্য বিপজ্জনক ফাঁদ হয়ে থাকার আশঙ্কা থেকেই যাবে।























