ঢাকা ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী পেলেন ডিলারশিপ; ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত

নাসিরনগরে সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, কাঠগড়ায় এমপি হান্নান

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:০০:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে

সংসদ সদস্য এম এ হান্নান

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সারের ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপিতে অসন্তোষ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্যের ছেলে, আপন ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলের রাজনীতিতে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের অনেকে ডিলারশিপ পাননি। পাশাপাশি নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য।

নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের পরিবারের তিন সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার উপজেলার নতুন সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রশ্ন, দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ভূমিকা রাখা নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে কী বিবেচনায় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা ডিলারশিপ পেলেন?

b baria
সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে আদনান সাদী (বাঁয়ে), ভগ্নিপতি আরক মিয়া (মাঝে) ও ভাগ্নের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার

১৩ ডিলারের তালিকায় এমপির পরিবারের তিনজন

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নের জন্য ১৩ জনকে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে গোকর্ণ ইউনিয়নে মোহাম্মদ আদনান সাদী, গোয়ালনগরে নুরুন্নাহার আক্তার এবং সদর ইউনিয়নে আরক মিয়া রয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতার দাবি, আদনান সাদী সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে। নুরুন্নাহার তাঁর ভাগিনা শরীফুল ইসলামের স্ত্রী এবং আরক মিয়া তাঁর আপন ভগ্নিপতি।

এই তিনজনের নিয়োগকে কেন্দ্র করেই স্বজনপ্রীতির অভিযোগ জোরালো হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সুবিধাসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার বিষয়টি সামনে থাকা প্রয়োজন। সেখানে সংসদ সদস্যের পরিবারের একাধিক সদস্যের নিয়োগ প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে সংসদ সদস্যের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে তাঁদের মতো যোগ্য আবেদনকারী ছিলেন না। নিয়ম মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ

সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান ফেসবুকে লেখেন, ‘সারের ডিলারে আওয়ামী লীগের দোসর!!! এমন হলে আওয়াজ তুলুন, দরকার হলে ঐ আকামে যাঁরা জড়িত তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে লিখুন।’

গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তাঁর ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, নাসিরনগরে সার ও চালের ডিলার পেতে বিএনপির কর্মী হওয়া জরুরি নয়; বরং ‘তেল’ ঠিক জায়গায় দিলেই হয়।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার নিয়োগে দলের ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তাঁদের মতে, দলীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নটি সামনে চলে আসায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কেউই দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদল ও বিএনপির চার নেতা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের কথা শুনেছেন বলেও জানিয়েছেন। তবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে প্রকাশিত তথ্যে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আলোচনায়

নতুন ডিলারদের কয়েকজনের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

তাঁদের অভিযোগ, সদর ইউনিয়নে ডিলার হওয়া আরক মিয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদ চৌধুরীর আপন ভাই। বুড়িশ্বরের জসিম মিয়া আগে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি স্থানীয় নেতাদের। তিনি উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানার মিয়ার ভাগিনা বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।

গোয়ালনগরের ডিলার নুরুন্নাহার আক্তারের স্বামী শরীফুল ইসলাম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে পারেন বলে স্থানীয় বিএনপির কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, সেই রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাঁর স্ত্রীর নামে ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে। নুরুন্নাহারের বাবা সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

এ ছাড়া চাতলপাড়ের শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে তাঁকে বহিষ্কার করা হয় বলে দলীয় সূত্রের ভাষ্য।

কুন্ডা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া রেনু মিয়া স্থানীয় যুবদলের সভাপতি অনু মিয়ার ভাই। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অনু মিয়া আগে সার ডিলার ছিলেন এবং তাঁর ডিলারশিপ বাতিল হয়েছিল। অন্যদিকে, ফান্দাউক ইউনিয়নের ডিলার শারমীন আক্তার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফয়েজ আনসারির স্ত্রী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাঁদের দাবি, স্বামী-স্ত্রীর কেউই আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

তবে এসব রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় নিয়োগে অনিয়মের স্বতন্ত্র প্রমাণ নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত যোগ্যতা, আবেদনকারীদের মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণের নথি যাচাই করেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

২৫ টন ধারণক্ষমতার গুদাম নিয়ে প্রশ্ন

সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে গুদামের সক্ষমতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডিলার হতে হলে ২৫ টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকতে হয়। গুদামের নির্ধারিত মাপ দৈর্ঘ্যে ২০ ফুট, প্রস্থে ১৫ ফুট এবং উচ্চতায় ১০ ফুট।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেকেরই নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদাম নেই। অভিযোগটি সত্য হলে তা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে কোন কোন ডিলারের গুদাম নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছে না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন প্রতিবেদন বা নথিভিত্তিক প্রমাণ নেই।

নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় ১০৬টি সার ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৮২৫ জন। সেখান থেকে ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়। প্রতিটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনজনের নাম সুপারিশ করে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা এমরান বলেন, তিনি সরকারি চাকরি করেন এবং সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন কমিটির উপদেষ্টা। এর বাইরে এ বিষয়ে তাঁর কিছু বলার নেই।

অন্যদিকে, নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে তাঁদের নামের তালিকা জেলায় পাঠানো হয়েছে। এরপর কীভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

অভিযোগ অস্বীকার এমপি হান্নানের

নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য এম এ হান্নান। তাঁর দাবি, সরকারের আইন ও বিধি মেনেই তাঁর ছেলে, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার স্ত্রী ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট তিন ইউনিয়নে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের তুলনায় যোগ্য আবেদনকারী তেমন কেউ ছিলেন না। নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগকে তিনি অসত্য বলে দাবি করেন।

অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে এম এ হান্নান বলেন, এটি সম্পূর্ণ গুজব; কোনো অভিযোগই সত্য নয়।
তবে সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করতে আবেদনকারীদের যোগ্যতার তুলনামূলক মূল্যায়ন, গুদাম পরিদর্শনের নথি, সুপারিশের ক্রম এবং চূড়ান্ত নিয়োগের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাসিরনগরের এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় রাজনীতি, সরকারি সুবিধাসংশ্লিষ্ট নিয়োগ এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠা মানেই অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং যাচাইযোগ্য তথ্যই এ বিতর্কের নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী পেলেন ডিলারশিপ; ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত

নাসিরনগরে সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, কাঠগড়ায় এমপি হান্নান

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:০০:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সারের ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপিতে অসন্তোষ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্যের ছেলে, আপন ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলের রাজনীতিতে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের অনেকে ডিলারশিপ পাননি। পাশাপাশি নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য।

নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের পরিবারের তিন সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার উপজেলার নতুন সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রশ্ন, দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ভূমিকা রাখা নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে কী বিবেচনায় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা ডিলারশিপ পেলেন?

b baria
সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে আদনান সাদী (বাঁয়ে), ভগ্নিপতি আরক মিয়া (মাঝে) ও ভাগ্নের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার

১৩ ডিলারের তালিকায় এমপির পরিবারের তিনজন

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নের জন্য ১৩ জনকে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে গোকর্ণ ইউনিয়নে মোহাম্মদ আদনান সাদী, গোয়ালনগরে নুরুন্নাহার আক্তার এবং সদর ইউনিয়নে আরক মিয়া রয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতার দাবি, আদনান সাদী সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে। নুরুন্নাহার তাঁর ভাগিনা শরীফুল ইসলামের স্ত্রী এবং আরক মিয়া তাঁর আপন ভগ্নিপতি।

এই তিনজনের নিয়োগকে কেন্দ্র করেই স্বজনপ্রীতির অভিযোগ জোরালো হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সুবিধাসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার বিষয়টি সামনে থাকা প্রয়োজন। সেখানে সংসদ সদস্যের পরিবারের একাধিক সদস্যের নিয়োগ প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে সংসদ সদস্যের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে তাঁদের মতো যোগ্য আবেদনকারী ছিলেন না। নিয়ম মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ

সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান ফেসবুকে লেখেন, ‘সারের ডিলারে আওয়ামী লীগের দোসর!!! এমন হলে আওয়াজ তুলুন, দরকার হলে ঐ আকামে যাঁরা জড়িত তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে লিখুন।’

গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তাঁর ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, নাসিরনগরে সার ও চালের ডিলার পেতে বিএনপির কর্মী হওয়া জরুরি নয়; বরং ‘তেল’ ঠিক জায়গায় দিলেই হয়।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার নিয়োগে দলের ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তাঁদের মতে, দলীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নটি সামনে চলে আসায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কেউই দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদল ও বিএনপির চার নেতা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের কথা শুনেছেন বলেও জানিয়েছেন। তবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে প্রকাশিত তথ্যে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আলোচনায়

নতুন ডিলারদের কয়েকজনের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

তাঁদের অভিযোগ, সদর ইউনিয়নে ডিলার হওয়া আরক মিয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদ চৌধুরীর আপন ভাই। বুড়িশ্বরের জসিম মিয়া আগে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি স্থানীয় নেতাদের। তিনি উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানার মিয়ার ভাগিনা বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।

গোয়ালনগরের ডিলার নুরুন্নাহার আক্তারের স্বামী শরীফুল ইসলাম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে পারেন বলে স্থানীয় বিএনপির কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, সেই রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাঁর স্ত্রীর নামে ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে। নুরুন্নাহারের বাবা সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

এ ছাড়া চাতলপাড়ের শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে তাঁকে বহিষ্কার করা হয় বলে দলীয় সূত্রের ভাষ্য।

কুন্ডা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া রেনু মিয়া স্থানীয় যুবদলের সভাপতি অনু মিয়ার ভাই। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অনু মিয়া আগে সার ডিলার ছিলেন এবং তাঁর ডিলারশিপ বাতিল হয়েছিল। অন্যদিকে, ফান্দাউক ইউনিয়নের ডিলার শারমীন আক্তার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফয়েজ আনসারির স্ত্রী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাঁদের দাবি, স্বামী-স্ত্রীর কেউই আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

তবে এসব রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় নিয়োগে অনিয়মের স্বতন্ত্র প্রমাণ নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত যোগ্যতা, আবেদনকারীদের মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণের নথি যাচাই করেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

২৫ টন ধারণক্ষমতার গুদাম নিয়ে প্রশ্ন

সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে গুদামের সক্ষমতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডিলার হতে হলে ২৫ টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকতে হয়। গুদামের নির্ধারিত মাপ দৈর্ঘ্যে ২০ ফুট, প্রস্থে ১৫ ফুট এবং উচ্চতায় ১০ ফুট।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেকেরই নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদাম নেই। অভিযোগটি সত্য হলে তা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে কোন কোন ডিলারের গুদাম নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছে না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন প্রতিবেদন বা নথিভিত্তিক প্রমাণ নেই।

নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় ১০৬টি সার ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৮২৫ জন। সেখান থেকে ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়। প্রতিটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনজনের নাম সুপারিশ করে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা এমরান বলেন, তিনি সরকারি চাকরি করেন এবং সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন কমিটির উপদেষ্টা। এর বাইরে এ বিষয়ে তাঁর কিছু বলার নেই।

অন্যদিকে, নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে তাঁদের নামের তালিকা জেলায় পাঠানো হয়েছে। এরপর কীভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

অভিযোগ অস্বীকার এমপি হান্নানের

নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য এম এ হান্নান। তাঁর দাবি, সরকারের আইন ও বিধি মেনেই তাঁর ছেলে, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার স্ত্রী ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট তিন ইউনিয়নে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের তুলনায় যোগ্য আবেদনকারী তেমন কেউ ছিলেন না। নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগকে তিনি অসত্য বলে দাবি করেন।

অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে এম এ হান্নান বলেন, এটি সম্পূর্ণ গুজব; কোনো অভিযোগই সত্য নয়।
তবে সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করতে আবেদনকারীদের যোগ্যতার তুলনামূলক মূল্যায়ন, গুদাম পরিদর্শনের নথি, সুপারিশের ক্রম এবং চূড়ান্ত নিয়োগের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাসিরনগরের এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় রাজনীতি, সরকারি সুবিধাসংশ্লিষ্ট নিয়োগ এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠা মানেই অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং যাচাইযোগ্য তথ্যই এ বিতর্কের নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।