দিনমজুর বাবার সংগ্রাম পেরিয়ে জজ হলেন কাজল

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৫৩:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
কখনো ঘরে খাবার থাকত না। ক্ষুধার্ত পেটেই ছুটতে হতো স্কুলে। মাথার ওপর ছিল এনজিওর কিস্তির চাপ, আর সংসার চালাতে দিনভর খেটে যেতেন বাবা। অভাবের সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই স্বপ্ন দেখেছিলেন বিচারক হওয়ার। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাইপুর গ্রামের কাজল পাঁড়ে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন তিনি।
কাজলের এই সাফল্যে শুধু তাঁর পরিবার নয়, বদলে গেছে পুরো গ্রামের পরিচয়ও। ২২ বছর আগে গড়ে ওঠা পার্বতীপুর ইউনিয়নের মাধাইপুর গ্রামে এতদিন কোনো সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন না। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গ্রামের প্রথম সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিচারকের আসনে বসতে যাচ্ছেন ভূমিহীন এক দিনমজুরের ছেলে।
কাজল পাঁড়ে মাধাইপুর গ্রামের ‘তুরি’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে। অভাবের কারণে তাঁর তিন বোনের পড়াশোনা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। অল্প বয়সেই তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়। আর কাজলের পড়াশোনার পথও ছিল কাঁটায় ভরা।
অনেক দিন এমনও গেছে, ঘরে খাবার না থাকায় না খেয়েই স্কুলে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবুও থামেননি। স্থানীয় মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি।
এরপর শুরু হয় উচ্চশিক্ষার লড়াই। প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেলেও দ্বিতীয়বার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন কাজল।
ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তখন নতুন করে সংগ্রামে নামেন বাবা নরেশ পাঁড়ে। কখনো এনজিওর কিস্তি পরিশোধের চিন্তা, কখনো বাড়ির দুধের গরু বিক্রি—ছেলের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়, সে জন্য সবকিছুই করেছেন তিনি।
মানুষের কাছে হাত না পেতে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে গিয়ে কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচিতে শ্রমিকের কাজও করেছেন। সেই শ্রমের আয়েই ছেলের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। অন্যদিকে কাজলও বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন। কিন্তু অভাব আর প্রতিকূলতা কোনোভাবেই তাঁর স্বপ্নকে দমাতে পারেনি।
অবশেষে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশ পাওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সেই সংগ্রামের ফল পেলেন কাজল।
ছেলের সাফল্যের খবর পাওয়ার পর আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না মা পঞ্চমী জেড়ি। তিনি বলেন, ছেলে ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন গ্রামের মানুষ আমাদের বাড়িতে আসছে, আনন্দে মন ভরে যাচ্ছে।
কাজলের বোন স্বপ্না পাঁড়ে বলেন, ‘আমরা দিন আনি, দিন খাই—এমন পরিবারের সন্তান। পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য না থাকায় আমাদের তিন বোনকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। আমরা প্রাথমিক শিক্ষাটুকুও শেষ করতে পারিনি। আমার ভাই পড়াশোনার জন্য অনেক কষ্ট করেছে।’
ছেলের জজ হওয়ার খবর পাওয়ার মুহূর্তটির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত নরেশ পাঁড়ে বলেন, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাঁর ছেলে ফোন করে জানায়, ‘বাবা, ভগবানের আশীর্বাদে আমি জজের চাকরি পেয়েছি।’ ছেলের মুখে এই কথা শুনে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি।
নিজের আঞ্চলিক ভাষায় নরেশ পাঁড়ে বলেন, ‘হামনি গরিব আবদিন। হামরা মাটি লাড়িচাড়ী। দিন খাটিলা দিন খাইলা। হামি চাই হামার ছোয়া মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। ভগবান যেই দায়িত্বটুকু দেইছে, সোঠা যেন ভালো হয়।’
কাজলের এই সাফল্যে আনন্দিত পুরো গ্রাম। স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমাহীন অভাবের মধ্যেও কাজল ও তাঁর পরিবার যেভাবে লড়াই চালিয়ে গেছে, এই সাফল্য তাঁদের প্রাপ্য।
নিজের সাফল্যকে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখছেন না কাজল পাঁড়ে। তিনি বলেন, ‘মাধাইপুর গ্রামের সন্তান হিসেবে প্রথম সরকারি চাকরি পাওয়ার বিষয়টি খুবই আনন্দের। এই আনন্দ শুধু আমার একার নয়; আমার পরিবার, গ্রাম ও আমার গোষ্ঠীরও।’
পড়াশোনার সময়ের সবচেয়ে কঠিন স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে কাজল বলেন, একপর্যায়ে তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তাঁর বড় বোন নিজের গরু বিক্রি করে তাঁকে টাকা দিয়েছিলেন। সেই দিনের কথা এখনো তাঁর মনে পড়ে।
কাজলের বিশ্বাস, বিচারালয়ে তাঁর উপস্থিতি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, তাঁর নিজের নৃগোষ্ঠীর তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার কারণ হবে।
কাজলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাজ্জাদ আলী বলেন, ‘গরিব ঘরের সন্তান কাজলের এমন সাফল্যে আমরা খুবই আনন্দিত। তাঁর জীবনের আরও সাফল্য কামনা করি।’
অভাব, অনটন আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে কাজল পাঁড়ে প্রমাণ করেছেন—স্বপ্নের পথে বাধা যতই কঠিন হোক, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে সাফল্যের দরজা একদিন খুলবেই।

























