জলবায়ু বদলের শহরে বাসযোগ্যতার নতুন ভাবনা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ং মান সাম

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৫৪:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাড়ছে, একই সঙ্গে দ্রুত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে গ্রীষ্মপ্রধান শহরগুলো। এমন বাস্তবতায় ভবিষ্যতের শহরকে কীভাবে আরও বাসযোগ্য, সহনশীল ও টেকসই করে গড়ে তোলা যায়—সে ভাবনাই তুলে ধরলেন স্থপতি ওয়ং মান সাম।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক পাবলিক লেকচারে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা, প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল স্থাপত্য নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা তুলে ধরেন তিনি। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সিলভার জুবিলি পাবলিক লেকচার সিরিজের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।
‘ফর্ম ইন্টেলিজেন্স: টুয়ার্ডস আ নিউ অ্যান্ড রিজেনারেটিভ ট্রপিক্যাল আরবানিজম’ শীর্ষক লেকচারে সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ওহা’র বিভিন্ন প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ওয়ং মান সাম।
বক্তব্যে তিনি ‘ফর্ম ইন্টেলিজেন্স’ ধারণার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এমন স্থাপত্যই ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর, যা শুধু একটি ভবন হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তার চারপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, জলবায়ু ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ওহা’র ‘গার্ডেন সিটি মেগা সিটি’ বইয়ের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরেন। ২০১৬ সালে ভেনিস বিয়েনালেতে উপস্থাপিত এই কাজের মাধ্যমে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় শহরগুলোকে মানুষ, প্রকৃতি, জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা ও কমিউনিটির সমন্বয়ে নতুনভাবে কল্পনার ধারণা তুলে ধরা হয়।
ওয়ং মান সামের আলোচনায় উঠে আসে সিঙ্গাপুরের পার্করয়্যাল কালেকশন পিকারিংয়ের উদাহরণও। ‘হোটেল ইন আ গার্ডেন’ ধারণায় তৈরি এ স্থাপনায় ধাপে ধাপে সাজানো স্কাই গার্ডেন ও বায়োফিলিক নকশাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে সবুজায়নের পরিমাণ মোট জমির আয়তনের ২০০ শতাংশেরও বেশি বলে জানান তিনি।
সিঙ্গাপুরের ওএশিয়া হোটেল ডাউনটাউনকেও জলবায়ু-সংবেদনশীল স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। ২৭ তলা এই ‘লিভিং টাওয়ার’-এর উন্মুক্ত ও সবুজে আচ্ছাদিত নকশা ভবন ঠান্ডা রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার ৪৩ শতাংশ এবং বাইরের দেয়ালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করে বলে জানান তিনি।
প্যান প্যাসিফিক অর্চার্ড প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে ওয়ং মান সাম দেখান, কীভাবে উল্লম্ব স্থাপত্যের মধ্যেও প্রকৃতির জন্য জায়গা তৈরি করা যায়। প্রকল্পটিতে ছয়তলা উচ্চতার চারটি উন্মুক্ত স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনটির সবুজায়ন বাতাস পরিশোধন, দূষণ কমানো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুধু ভবন নয়, পুরো শহরকেও একই দর্শনে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। উত্তর জাকার্তায় ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের জন্য ওহা’র করা একটি মহাপরিকল্পনার উদাহরণ দিয়ে জানান, সেখানে ছাদজুড়ে ক্যানোপি, বসবাস ও কাজের পৃথক স্তর, রেইনফরেস্টের আদলে সবুজায়ন এবং ভূগর্ভস্থ পরিবহন ও অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ওয়ং মান সাম বলেন, ২১০০ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরকে এমন একটি শহর হিসেবে গড়ে তোলাই ওহা’র দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি পাশাপাশি টিকে থাকবে। সম্পদের পুনর্ব্যবহার, প্রকৃতির সঙ্গে নগরব্যবস্থার সমন্বয় এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাই হবে সেই ভবিষ্যৎ শহরের অন্যতম ভিত্তি।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির নিজস্ব ক্যাম্পাসের নকশার প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। ক্যাম্পাসটির নকশা নিয়ে পরিচালিত একটি সামাজিক জরিপের ফলাফল উল্লেখ করে তিনি জানান, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই ক্যাম্পাসের কারণে তারা ব্র্যাক কমিউনিটির অংশ হতে গর্ববোধ করেন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বলেন, “পুরো দেশ আমাদের এই ক্যাম্পাস নিয়ে গর্ব করে। এটি শুধু একটি ক্যাম্পাস নয়, এটা যেন প্রকৃতিরই একটি অংশ। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এটি প্রকৃতিকেও সমৃদ্ধ করে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, ট্রেজারার আরিফুল ইসলাম, রেজিস্ট্রার ডেভিড ডাউল্যান্ড এবং স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের ডিন প্রফেসর ফুয়াদ হাসান মল্লিক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অফিস অব কমিউনিকেশন্সের পরিচালক খায়রুল বাশার।



























