জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড
মোবাইলের এনক্রিপ্টেড বার্তা ও ‘সিক্রেট পেপার’ ঘিরে অনুসন্ধান

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩০:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর পুনঃতদন্তে নতুন কিছু তথ্যের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছেন মামলার বিশেষ প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনের মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য ও বিভিন্ন ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের সূত্র খুঁজছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
পাশাপাশি জিয়াউর রহমান হত্যার পর মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যু, তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং প্রেসিডেন্টের কক্ষে কথিত একটি ‘সিক্রেট পেপার’ খোঁজার ঘটনাও নতুন করে তদন্তের আওতায় এসেছে।
গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তিনি পলাতক ছিলেন।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান হত্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসিডেন্টের কক্ষে নথিপত্র তল্লাশি এবং মরদেহ সরানোর কাজেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুরোনো রহস্যের নতুন অনুসন্ধান
মোজাফফর গ্রেপ্তারের পর হত্যাকাণ্ডের নানা অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে পুরোনো নথি, সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং নতুন ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বিশেষ প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যু নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন ও রহস্য রয়েছে। সেই রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে মোজাফফর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মোজাফফরের সঙ্গে দেশের ভেতরে ও বাইরে কয়েকজন ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। কেন এসব যোগাযোগ হয়েছিল, এর সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং দীর্ঘদিন পরও কেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রবেশের পর মোজাফফর কার সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন এবং কীভাবে ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করেছেন, সেই বিষয়েও তদন্ত চলছে।
মোবাইলে মিলেছে এনক্রিপ্টেড বার্তা
মোজাফফরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ডিজিটাল আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ প্রসিকিউটরের দাবি, ফোনে কিছু এনক্রিপ্টেড বার্তার সন্ধান মিলেছে।
এসব বার্তার পাশাপাশি কয়েকটি ছবিও পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে বিশেষ ধরনের সংকেত বা তথ্য আদান-প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
মোজাফফর এত বছর কার সঙ্গে এবং কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ রাখতেন, সেই যোগাযোগের সঙ্গে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—তদন্তে এসব প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মঞ্জুরের মৃত্যু নিয়েও নতুন প্রশ্ন
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যু নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জিয়া হত্যার পর মঞ্জুরকে কীভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং পুলিশের হেফাজতে থাকার পর কীভাবে তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়—সেসব বিষয় তদন্তের আওতায় এসেছে।
বিশেষ প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, পুলিশের হেফাজতে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তাকে কারা সেনা হেফাজতে নিয়ে গেল এবং তৎকালীন প্রশাসন কেন তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মঞ্জুরের মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তাঁর পোস্টমর্টেম কে করেছিলেন, শরীরে গুলির চিহ্নসংক্রান্ত কী তথ্য পাওয়া গিয়েছিল এবং তৎকালীন তদন্তে এসব বিষয় কেন স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি—সেসব তথ্যও পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে।
বিশেষ প্রসিকিউটরের ভাষ্য, জিয়াউর রহমানকে কে গুলি করেছিলেন এবং মঞ্জুর কীভাবে নিহত হয়েছিলেন—এই দুটি প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি অমীমাংসিত।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য কী ছিল?
১৯৮১ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, সেটিও নতুন তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। এ জন্য সে সময়ের জীবিত সেনা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁদের অধীনস্থ ও সমসাময়িক কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি পুরোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নথি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্যও পর্যালোচনা করা হবে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের আশা, এসব তথ্য একত্র করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং অভ্যুত্থানের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
রহস্যের কেন্দ্রে কথিত ‘সিক্রেট পেপার’
পুনঃতদন্তে সবচেয়ে আলোচিত নতুন বিষয়গুলোর একটি হলো কথিত একটি ‘সিক্রেট পেপার’। তদন্তকারীদের কাছে এমন তথ্য এসেছে যে, জিয়াউর রহমান হত্যার পর তাঁর কক্ষে বিশেষ একটি গোপন নথি খোঁজার চেষ্টা হয়েছিল।
ওই নথিতে কী ছিল, কেন সেটি উদ্ধারের জন্য এত আগ্রহ দেখানো হয়েছিল এবং এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত দল।
এ ছাড়া জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে লেফটেন্যান্ট মোসলেহ উদ্দিন, মেজর ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ মো. মুনির এবং ক্যাপ্টেন মো. ইলিয়াসের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর পুরোনো সাক্ষ্য, নথি ও তথ্যের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল আলামত যুক্ত হওয়ায় জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসতে পারে বলে আশা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।




















