প্রকৃতির রুদ্ররূপে নেপাল, বিপর্যয়ের মাঝেই উঠছে কিছু প্রশ্ন

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৫:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্ররূপে বিপর্যস্ত নেপাল। ভয়ংকর হড়পা বানের ধ্বংসযজ্ঞে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। উদ্ধারকাজ চললেও মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে এখনো রয়েছে অনিশ্চয়তা। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় শুধু নেপালের দুর্বল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেই সামনে আনেনি, বরং হিমালয়ের পরিবেশগত সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভারত-চীন-নেপাল ভূরাজনীতিকে ঘিরেও নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নেপাল এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঠমান্ডুর নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদ এলাকা থেকে শুরু করে থামেলের মতো ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র—দেশটির সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার নানা চিত্র সেখানে দৃশ্যমান। কখনো গণতন্ত্র, কখনো রাজতন্ত্র, কখনো কমিউনিস্ট শাসন—দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে হিমালয়ঘেরা এই দেশ।
রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ড, রাজতন্ত্রের পতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সর্বশেষ ‘জেন জি’ আন্দোলন—নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিবর্তনের ঘটনা কম নয়। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও দেশটির আর্থসামাজিক কাঠামোয় প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
এর মধ্যেই গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ হড়পা বান নেপালের ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে সামনে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। হাজারের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও চার হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবারও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে স্বল্প সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে এই হড়পা বানের ভয়াবহতা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা পাথর, কাদা, বরফ ও পানির প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদ গ্রাস করেছে।
তবে বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। বিভিন্ন দেশ নেপালকে উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তার প্রস্তাব দিলেও সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল এলাকায় বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে কাজ করতে দিতে নেপাল সরকারের অনীহার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দলকে তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, চীনের কৌশলগত স্বার্থ এবং তিব্বত সীমান্তের ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতাই এর পেছনে বড় কারণ।
হড়পা বানের উৎপত্তি নিয়েও চলছে নানা বৈজ্ঞানিক আলোচনা। ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী লাংটাং-লিরুং অঞ্চলের কোনো উঁচু পাহাড়ে ব্যাপক শিলাধস ও বরফধসের ঘটনা ঘটার পর এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
ভূতাত্ত্বিকদের ভাষায়, উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে বিশাল শিলা ও বরফের স্তূপ একসঙ্গে ধসে পড়লে অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক স্রোত তৈরি হতে পারে। পাথর, বরফ, কাদা ও পানির এই প্রবাহ কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিচের নদী অববাহিকায় নেমে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতেও একই ধরনের পাহাড়ি বিপর্যয় দেখা গিয়েছিল। হিমালয় অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে তুলনামূলক নবীন ও ভঙ্গুর হওয়ায় সেখানে শিলাধস, ভূমিধস ও হিমবাহধসের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে। এতে পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা ও আকার বাড়ছে। এসব হ্রদ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা গ্লোফ, যা মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিতে পারে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, হিমালয়ের এই পরিবর্তন শুধু নেপাল বা ভারতের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর নতুন করে সামনে এসেছে হিমালয় অঞ্চলের তথ্য বিনিময় ও যৌথ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী হিমবাহ, নদী ও পাহাড়ি অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ তথ্য বিনিময় কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীনের বৃহৎ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও ভারত দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ভারতের আশঙ্কা, হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশে বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প ভবিষ্যতে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়। এটি হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রকৃতির এই ভয়ংকর বার্তার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—হিমালয়কে ঘিরে থাকা দেশগুলো কি ভবিষ্যতের বিপর্যয় মোকাবিলায় তথ্য, বিজ্ঞান ও মানবিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই আরও বড় কোনো দুর্যোগের অপেক্ষা করবে?























