দেড়-দু’লাখেই ফায়ার সেফটি, সিল হচ্ছে বেআইনি ৭০ হোটেল!

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৪৯:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় একের পর এক বেআইনি হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। সূত্রের দাবি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শুধু নিউ মার্কেট জোনেই ৬০ থেকে ৭০টি হোটেল অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
নিউ মার্কেটের ‘শিখা-ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর তদন্তে নেমে সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম না মেনেও অর্থের বিনিময়ে কিছু হোটেলকে ‘ফায়ার সেফটি’ ও ‘ফায়ার লাইসেন্স’ পাইয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
‘দেড়-দুই লাখে ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সদ্য সিল হওয়া কয়েকটি হোটেলের মালিকরা জানিয়েছেন, নগদ দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁরা তিন বছরের ‘ফায়ার সেফটি’ সার্টিফিকেট পেয়েছেন। এর সঙ্গে ‘ফায়ার লাইসেন্স’ পেতে আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা বা তার কিছু বেশি খরচ হয়েছে বলে অভিযোগ।
মার্কুইজ স্ট্রিটের একাধিক হোটেল নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দমকলের এক সাবেক স্টেশন অফিসারের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পর পুরসভার ট্রেড লাইসেন্স এবং বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার পথও সহজ হয়েছে।
এসব অভিযোগের পর প্রশ্ন উঠেছে—শুধু হোটেল মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই কি তদন্ত শেষ হবে, নাকি অনুমোদন দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত দমকল ও পুরসভার কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হবে?
নজরে গত এক দশকের দমকল কর্মকর্তারা
শিখা-ইন অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে বিশেষজ্ঞ দল ও পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)-এর নজরে এখন গত ১০ থেকে ১২ বছরে দমকলের সদর দপ্তরে ‘ফায়ার সেফটি’ ও ‘ফায়ার লাইসেন্স’ সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং কারা নিয়মবহির্ভূতভাবে অনুমোদন দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২০০৩ সালের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন
দমকল বিভাগে জনবল সংকটের কারণে ২০০৩ সালে ‘ফায়ার সেফটি’ ও ‘ফায়ার লাইসেন্স’ প্রদানের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাকে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর টেন্ডারও হয়েছিল। ১০-১২টি সর্বভারতীয় সংস্থা ‘গ্যারান্টি মানি’ জমা দিয়েছিল বলে জানা যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।
দমকলের সাবেক অধিকর্তা বিভাস গুহ দাবি করেছেন, ২০০৩ সালের সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো।
‘সেলফ ডিক্লারেশন’ থেকেই শুরু বিতর্ক
পরবর্তী সময়ে তিন বছরের জন্য ফায়ার সংক্রান্ত দুটি সার্টিফিকেট পেতে অনলাইন আবেদনের পাশাপাশি হোটেল মালিকদের ‘সেলফ ডিক্লারেশন’ নেওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়।
অভিযোগ, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে দিঘা-মন্দারমণির বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম না মেনেও কিছু হোটেল অনুমোদন পেয়েছে। এসব সার্টিফিকেটের ভিত্তিতেই পরে ট্রেড লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
দমকলের এক সিনিয়র কর্মকর্তার দাবি, ফায়ারের এই দুটি সার্টিফিকেট দেওয়ার সুযোগকে কেন্দ্র করে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পোস্টিং পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কারও কারও জীবনযাত্রায় অস্বাভাবিক পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে।
তদন্তের পরিধি বাড়ছে
এরই মধ্যে তারাপীঠে বিদেশিনীর হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক স্টেশন অফিসারের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাও সামনে এসেছে।
শিখা-ইন অগ্নিকাণ্ডের পর নিউ মার্কেটের হোটেলগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান শুরু হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—বেআইনি হোটেল বন্ধ করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না।
তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে শুধু হোটেল মালিক নয়, নিয়মবহির্ভূত অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।






















