চার মাসে ১৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান, ভর্তুকি চায় বিপিসি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:১৩:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত চার মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এই লোকসান পূরণে সরকারের কাছে সমপরিমাণ ভর্তুকি চেয়েছে বিপিসি।
মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত লোকসানের হিসাব ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ২৮ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ অর্থ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, বিপণন ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসির আয়-ব্যয় মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম এবং দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম ছাড়াও পরিবহন, জাহাজভাড়া, বীমা ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে পরিবহন ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয়ও বেড়ে যায়। কিন্তু দেশের বাজারে একই হারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না হওয়ায় আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম দামে তেল বিক্রি করতে হয়েছে বিপিসিকে।
চার মাসে লোকসান ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা
মন্ত্রণালয়ের চিঠি অনুযায়ী, মার্চে বিপিসির লোকসান ছিল ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকায়। মে মাসে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৬২১ কোটি এবং জুনে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা।
চার মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশের বাজারে সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ না দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। এ কারণে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বিপিসির লোকসানের অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
ডিজেল আমদানিতে বড় ধাক্কা
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানিতে গড়ে ব্যয় হতো প্রায় ৮৬ ডলার। জুনে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে অকটেনের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে।
এর আগে বিপিসি জানিয়েছিল, দেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় মিলিয়ে খরচ পড়ছিল ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে লোকসান ছিল ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।
অকটেন প্রতি লিটার ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানি ব্যয় ছিল ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা। ফলে প্রতি লিটারে লোকসান দাঁড়ায় ৩১ টাকা ৬১ পয়সা।
তখন দাম সমন্বয় না করা হলে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল সংস্থাটি। পরে ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় বিপিসির লোকসান পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় বাড়ছে আমদানি ব্যয়
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে। জাহাজভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিপিসির ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি আমদানির কারণে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আমদানি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপিসি ছিল লাভে
অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার আগে বিপিসির আর্থিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে সংস্থাটি ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এতে ব্যয় হয় ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে খরচ হয় ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
আর ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।
ভর্তুকির বোঝা বাড়ার শঙ্কা
বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন, ভর্তুকির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের আশা করছেন।
তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরুর পর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিপিসি সরকারকে কর ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পাশাপাশি একটি সরকারি তহবিলেও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বিপিসির হিসাবের বাইরে গিয়ে সরকারের ওপরও নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকলে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি ভর্তুকির পরিমাণও আরও বাড়তে পারে। ফলে জ্বালানি বাজারের এই সংকট এখন শুধু বিপিসির লোকসানের বিষয় নয়, বরং সরকারের রাজস্ব ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
























