ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অসহায় বৃদ্ধের পাশে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন ব্যাংক থেকে ব্যাংকে টাকা লেনদেনে নতুন ফি নির্ধারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সমাজ কল্যাণ পরিষদের পরিচিতি সভা ও শপথ পানি সরবরাহের প্রযুক্তি শিখতে ৫৪ দিনের জাপান সফরে ওয়াসার স্টোর ও কেনাকাটার কর্মকর্তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় রাজপথে আন্দোলন যানজট কমাতে ইনার সার্কুলার রিং রোড ও বৃত্তাকার নৌপথে জোর প্রধানমন্ত্রীর সিন্দুক নয়, এখন কম্পিউটার নিরাপত্তাই বড় চ্যালেঞ্জ: তথ্যমন্ত্রী জানালার গ্রিল কেটে বিচারকের বাসায় চুরি ইন্টারনেট নেই, তবুও বিল: ৬৫৪ স্কুলে সরকারি অর্থ উত্তোলন হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং  

ইন্টারনেট নেই, তবুও বিল: ৬৫৪ স্কুলে সরকারি অর্থ উত্তোলন

মোঃ বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও)
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঠাকুরগাঁও জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের নামে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ অপচয় ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ টেলিওয়ের কমিউনিকেশন (ইডিসি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান জেলার শত শত বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ না দিয়েও মাসের পর মাস সরকারি বিল উত্তোলন করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলায় মোট ৯৯৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫৪টি বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ইন্টারনেট সেবা প্রদানের চুক্তি রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ের বিপরীতে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে বিল পরিশোধ করা হয়। সে হিসাবে প্রতি মাসেই কয়েক লাখ টাকা এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ হলো, বহু বিদ্যালয়ে কেবল রাউটার বা প্রয়োজনীয় ডিভাইস স্থাপন করেই দায়িত্ব শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কোথাও ইন্টারনেট সংযোগ অচল, কোথাও সংযোগই চালু হয়নি, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কোনো সেবা না থাকলেও নিয়মিত বিল উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদ্যালয়ে সামান্য দায়িত্বে অবহেলা হলেই শিক্ষকদের শোকজ বা প্রশাসনিক জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। অথচ একটি প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস কার্যকর সেবা না দিয়েই সরকারি অর্থ উত্তোলন করছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাবকেই স্পষ্ট করে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, ইন্টারনেট সেবা নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে তাদের কাছেও একাধিক অভিযোগ এসেছে।

রাণীশংকৈল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উপজেলার ১২২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টি বিদ্যালয় ইন্টারনেট সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। অভিযোগ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর বিল কর্তন করে বাকি বিদ্যালয়ের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোম্পানিটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাহিম উদ্দিন জানান, উপজেলার ১৫৩টি বিদ্যালয়ের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অতুল চন্দ্র রায় বলেন, উপজেলার ৮৬টি বিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি ছিল এবং সব বিদ্যালয়ের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে অনেক শিক্ষক ইন্টারনেট সেবার মান নিয়ে অভিযোগ করেছেন। আগামী মাসিক সমন্বয় সভায় কোম্পানির প্রতিনিধিকে ডেকে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা হবে এবং ভবিষ্যতে সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ফজলুর রহমান বলেন, চুক্তিভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর বিল পরিশোধ করা হলেও কোম্পানির সেবার মান সন্তোষজনক ছিল না। এখন থেকে সেবা যাচাই-বাছাই করেই বিল পরিশোধ করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে টেলিওয়ের কমিউনিকেশনের স্থানীয় ম্যানেজার আব্দুল আওয়াল বলেন, কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হওয়ার ২২ মাস হলেও তারা মাত্র প্রায় ১২ মাসের বিল পেয়েছেন। বিল নিয়মিত না পাওয়ায় অনেক জায়গায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তার চুরি, রাউটার হারিয়ে যাওয়া এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এখন থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার প্রত্যয়ন দিতে হবে। সেই প্রত্যয়নের ভিত্তিতেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিল পরিশোধ করবেন। কোনো বিদ্যালয়ের প্রত্যয়ন ছাড়া কোনো বিল দেওয়া হবে না।

তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে যদি বহু বিদ্যালয়ে কার্যকর ইন্টারনেট সেবা না-ই থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে নিয়মিত বিল পরিশোধ হলো? কারা সেবা যাচাই করেছেন এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে কি নাএসব বিষয় খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকৃত সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ইন্টারনেট নেই, তবুও বিল: ৬৫৪ স্কুলে সরকারি অর্থ উত্তোলন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

ঠাকুরগাঁও জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের নামে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ অপচয় ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ টেলিওয়ের কমিউনিকেশন (ইডিসি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান জেলার শত শত বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ না দিয়েও মাসের পর মাস সরকারি বিল উত্তোলন করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলায় মোট ৯৯৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫৪টি বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ইন্টারনেট সেবা প্রদানের চুক্তি রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ের বিপরীতে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে বিল পরিশোধ করা হয়। সে হিসাবে প্রতি মাসেই কয়েক লাখ টাকা এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ হলো, বহু বিদ্যালয়ে কেবল রাউটার বা প্রয়োজনীয় ডিভাইস স্থাপন করেই দায়িত্ব শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কোথাও ইন্টারনেট সংযোগ অচল, কোথাও সংযোগই চালু হয়নি, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কোনো সেবা না থাকলেও নিয়মিত বিল উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদ্যালয়ে সামান্য দায়িত্বে অবহেলা হলেই শিক্ষকদের শোকজ বা প্রশাসনিক জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। অথচ একটি প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস কার্যকর সেবা না দিয়েই সরকারি অর্থ উত্তোলন করছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাবকেই স্পষ্ট করে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, ইন্টারনেট সেবা নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে তাদের কাছেও একাধিক অভিযোগ এসেছে।

রাণীশংকৈল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উপজেলার ১২২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টি বিদ্যালয় ইন্টারনেট সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। অভিযোগ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর বিল কর্তন করে বাকি বিদ্যালয়ের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোম্পানিটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাহিম উদ্দিন জানান, উপজেলার ১৫৩টি বিদ্যালয়ের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অতুল চন্দ্র রায় বলেন, উপজেলার ৮৬টি বিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি ছিল এবং সব বিদ্যালয়ের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে অনেক শিক্ষক ইন্টারনেট সেবার মান নিয়ে অভিযোগ করেছেন। আগামী মাসিক সমন্বয় সভায় কোম্পানির প্রতিনিধিকে ডেকে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা হবে এবং ভবিষ্যতে সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ফজলুর রহমান বলেন, চুক্তিভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর বিল পরিশোধ করা হলেও কোম্পানির সেবার মান সন্তোষজনক ছিল না। এখন থেকে সেবা যাচাই-বাছাই করেই বিল পরিশোধ করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে টেলিওয়ের কমিউনিকেশনের স্থানীয় ম্যানেজার আব্দুল আওয়াল বলেন, কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হওয়ার ২২ মাস হলেও তারা মাত্র প্রায় ১২ মাসের বিল পেয়েছেন। বিল নিয়মিত না পাওয়ায় অনেক জায়গায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তার চুরি, রাউটার হারিয়ে যাওয়া এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এখন থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার প্রত্যয়ন দিতে হবে। সেই প্রত্যয়নের ভিত্তিতেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিল পরিশোধ করবেন। কোনো বিদ্যালয়ের প্রত্যয়ন ছাড়া কোনো বিল দেওয়া হবে না।

তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে যদি বহু বিদ্যালয়ে কার্যকর ইন্টারনেট সেবা না-ই থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে নিয়মিত বিল পরিশোধ হলো? কারা সেবা যাচাই করেছেন এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে কি নাএসব বিষয় খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকৃত সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।