মাদক সেবনের কারন – পরিত্রাণের পথ.
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫৩:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে
যশোর পৌর পার্ক পুকুর পাড়ে একটি বেঞ্চে প্রায়ই প্রতিদিন বিকালে নিরবকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়। ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র সে, কিন্তু চোখে-মুখে সবসময় এক চরম একাকিত্বের ছায়া। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান নিরব। ব্যবসায়ী বাবা, চাকরিজীবী মায়ের ব্যস্ত সংসারে নিরবের সাথে কথা সঙ্গ দেওয়ার কেউ নেই। ভালো রেজাল্ট করার চাপ ছাড়া পরিবার থেকে কোনো মানসিক সমর্থন পেত না।
এই একাকিত্বের সুযোগ নিল মাদক। কলেজের এক সহপাঠী নিরবকে মাদকের অন্ধকারে পা বাড়াতে টেনে নিল। কিন্তু মাদক তাকে শান্তি দেয়নি, বরং তার ভেতরের বিষাদ আর একাকিত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। তার রেজাল্ট খারাপ হতে লাগল, আর সেই সাথে বাড়তে লাগল বাবা-মায়ের তিরস্কার। কেউ একবারও জানতে চাইল না নিরবের কী হয়েছ?
একদিন ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে না পারায় শিক্ষক সবার সামনে নিরবকে প্রচণ্ড বকা দিলেন। নীলয়ের মনে হলো, তার চারপাশের পৃথিবীটা একটা অন্ধকার দেয়াল, কেউ তার কথা শোনে না – বোঝে না। সেদিন রাতে নীরব ডাইরিতে লিখে আত্মঘাতির সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই নিরবের ফোনে একটা মেসেজ এল। তাদের বিভাগের নতুন তরুণ শিক্ষক আসিফ স্যারের মেসেজ। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ নিয়ে উন্মুক্ত আড্ডার আয়োজন করেছেন। যেখানে কোনো বিচার করা হবে না, শুধু মনের কথা বলা হবে।
নিরব শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে বসল ঘরের এক কোণায়। আসিফ স্যার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ”এখানে আমরা কেউ শিক্ষক নই, কেউ শিক্ষার্থী নই। আমরা সবাই মানুষ। আমাদের কষ্ট, ক্ষোভ, হতাশার কথা আজ আমরা নির্দ্বিধায় বলব। কেউ কাউকে শাসন করব না, শুধু শুনব।”
একে একে শিক্ষার্থীরা তাদের ভেতরের লুকিয়ে থাকা কষ্টের কথা, বলতে লাগলো। নিরব অবাক হয়ে দেখল, সে একা নয়—তার মতো অনেকেই এই অদৃশ্য লড়াই লড়ছে। এসময় নিরবের চোখের ছেড়ে দিল। সে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল তার মাদকের আসক্তির কথা, তার একাকিত্বের কথা, তার ভেতরের জমে থাকা সব ক্ষোভের কথা।
আসিফ স্যার নিরবকে বকা না দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন বল্লেন “তুমি যে বলতে পেরেছ, এটাই তোমার সবচেয়ে বড় জয়। আমরা একসাথে এই অন্ধকার থেকে বের হব।”
সেই দিন থেকে নিরব জীবন বদলাতে শুরু করল। আসিফ স্যার নিরবের বাবা-মায়ের সাথেও কথা বললেন। নিরবের বাবা-মা বুঝতে পারলেন, সন্তানের পেছনে টাকা খরচ করার চেয়ে তাকে সময় দেওয়া এবং তার কথা শোনা কতটা জরুরি ছিল।
শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, অভিভাবকের ভূমিকায় পালন করে শিক্ষার্থীর মানসিক সংকটে পাশে দাঁড়ান। সন্তানদের ওপর সফলতার চাপ না দিয়ে, তাদের মনের কথা শোনার অভ্যাস করেন। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সিলর রাখা এবং শিক্ষার্থীদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য ” ফোরাম তৈরি করা জরুরী।
মানুষ যখন তার কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারে, তখন তার ভেতরের অন্ধকার কেটে যায়। পারস্পরিক কথা বলা এবং সহমর্মিতাই পারে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক, সামাজিক অবক্ষয় ও আত্মহত্যার হাত থেকে রক্ষা করতে।

















