নবজন্ম হোক

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪১:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
মরু ভূমির চারদিকে শুধু এক নিঃসঙ্গতা। একলা ঘরে জানালা তাকিয়ে মনটা আজ বড্ড আনমনে।কোলাহলমুখর এই শহরের মাঝেও আমি যেন এক অচেনা পথিক, যার কোন ঠিকানা নেই। এক বুক ক্লান্তি আর একাকীত্ব নিয়ে প্রতিদিন ভাবি, এখান থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে যাই -যেখানে শুরু হবে এক নতুন অভিযান। কিন্তু বারবার মনে হয় এই অচেনা বৃত্তে আর ফিরে আসা সম্ভব না।
দিয়ে হঠাৎ করেই আকাশের মুখ ভার হলো। তপ্ত দুপুরে ধুলো উড়িয়ে নামল উতলা শ্রাবন। মেঘের গুরুগুরু ডাক যেন কোনো এক অজানা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এলো। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেই স্পর্শ করলাম প্রথম ফোঁটা। বুকের মধ্যে জমে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস হালকা হয়ে এলো। বাইরে তখন অবিরাম বৃষ্টি। আমার ভেতর এতকাল যেন এক তপ্ত মরুভূমি হয়ে ছিল, যেখানে সুখের কোনো চারাগাছ জন্মায়নি। আজ এই ধারাবর্ষণ যেন আমার ভেতরের সেই জন্ম-জন্মান্তরের পিপাসা মিটাই। আমি আকুল হয়ে ভিজতে লাগলাম সেই বৃষ্টির জলে। এই শ্রাবনের বৃষ্টিতে কেবল প্রকৃতি নয়, আমাদের মাঝে যে দূরত্বের দেওয়াল ছিল, তা গলিয়ে দিয়ে এক অভূতপূর্ব জোয়ার এলো মনের নদীতে। সেই জোয়ারের জল আর তীব্র স্রোত যেন এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যার রূপ নিল। সেই আবেগের বন্যায় ভেসে গেলাম।
ভেসে যেতে যেতে এসে পৌঁছালাম এক মহাসাগরের বুকে। সাগরের মধ্যভাগ তখন শান্ত, উত্তাল ঢেউগুলো স্তিমিত। ঠিক মাঝখানে জেগে থাকা একনির্জন, কোলাহল বিহীন দ্বীপে আশ্রয় হলো। সেখানে কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নেই; আছে শুধু এক আদিম নীরবতা।
কিন্তু প্রকৃতি তো সব সময় শান্ত থাকে না। দ্বীপের একপাশে দাঁড়িয়ে পাহাড় যেন শতাব্দীর পর শতাব্দি এই মহাসমুদ্রকে পাহারা দিচ্ছে। হঠাৎ করেই সেই সাগর আবার হুঁশে উঠল আছড়ে পড়তে লাগলো প্রকাণ্ড সব ঢেউ। চারপাশ কাঁপিয়ে টালমাতাল করে তুলল সাগরের সেই ভয়ংকর গর্জন।
সেই গর্জন যেন আমাদের মনের ভেতরের অহংকার আর ভুলগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আমরা মুখোমুখি দাঁড়ালাম নিজেদের অপরাধবোধের। চোখের কোণে জমে থাকা অভিমান ধুয়ে গেল ক্ষমা আর গভীর অনুতাপে। একে অপরের হাত ধরে আমরা বুঝে নিলাম, ভালোবাসায় কোনো জয়-পরাজয় থাকে না, থাকে শুধু সমর্পণ।
সেই দ্বীপের এক কোণে, যেখানে পাহাড়ের ঢালে ঘন জঙ্গল, সেখানে যেন এক প্রাচীন রূপকথা জীবন্ত হয়ে উঠল। কোনো এক যোগী যেন তুষারাবৃত হিমালয় পর্বত ছেড়ে এই সমুদ্রঘেরা অরণ্যে এসে বসেছেন। তিনি মগ্ন তাঁর গভীর ধ্যানে।
সংসারের যাবতীয় মোহ আর মায়ায় জড়িয়ে থাকা মানুষ; কিন্তু সেই যোগীর নিস্পৃহতা দেখে সমস্ত মায়া কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ধ্যানের সেই চরম মুহূর্তে আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হলো এক আধ্যাত্মিক সত্য। হৃদয়ের গভীর থেকে এক অদ্ভুত আকুলতা উথলে উঠল, যাকে বলে ধ্যান কান্না। সেই পবিত্র অশ্রুতে ভাসে চোখ।
সব মেঘ কেটে গেল, শান্ত হলো সমুদ্র। প্রকৃতির এই রূপান্তরের মাঝেই বেজে উঠল এক অনাহত ধ্বনি—এক পরম মহামিলন। প্রকৃতির সেই শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমার পুরোনো সত্তার মৃত্যু হলো। আর সেই শূন্যতা ভেদে, ধুয়েমুছে সাফ হওয়া এক নতুন ভোরের আলোয় উদিত হলো নতুন প্রাণ।
















