ঢাকা ১২:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫০ কোটির দেয়াল! চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডারে কার সুবিধা?

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৩:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কন্টেইনার এক ইয়ার্ড থেকে অন্য ইয়ার্ডে স্থানান্তরের কাজটি দেখতে সাধারণ একটি সেবামূলক কার্যক্রম মনে হলেও শুধু এই কাজেই একটি প্রতিষ্ঠানের পকেটে ঢোকে বছরে ২০ কোটি টাকা। কাজটির নতুন দরপত্র ঘিরে এখন বন্দর অঙ্গনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। ১৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র প্রকাশ করে। গোপনে অচেনা পত্রিকায় প্রকাশিত সেই দরপত্রের শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে গত ১০ বছরের মধ্যে দেশের কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে অন্তত ৫০ কোটি টাকার একই ধরনের কাজ সফলভাবে শেষ করার প্রমাণ দিতে হবে, বার্ষিক টার্নওভার থাকতে হবে ন্যূনতম ১২ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে ১০৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশে কার্যত সচল সমুদ্রবন্দর দুটি—চট্টগ্রাম ও মোংলা।

মোংলায় এই মাত্রার অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার স্থানান্তরের কাজ নিয়মিত হয় না। ফলে এই একটি শর্তেই দেশের শত শত অভিজ্ঞ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ও আইসিডি (অফডক) অপারেটর শুরুতেই প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাচ্ছে, টিকে থাকে মূলত দুটি প্রতিষ্ঠান বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী তরফদার রুহুল আমীনের ‘সাইফ পাওয়ারটেক’। বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বদলে এমন কিছু নজিরবিহীন যোগ্যতা ও আর্থিক শর্ত দিয়ে দরপত্র সাজানো হয়েছে, যাতে আগে নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।

গোপনে অচেনা পত্রিকায় প্রকাশিত নতুন দরপত্রে উল্লেখিত শর্তাবলীর অংশবিশেষ। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বদলে এমন কিছু নজিরবিহীন যোগ্যতা ও আর্থিক শর্ত দিয়ে দরপত্র সাজানো হয়েছে, যাতে আগে নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।

৫০ কোটি টাকার অভিজ্ঞতার দেয়াল
নতুন দরপত্রের সবচেয়ে আলোচিত শর্ত হলো অভিজ্ঞতার মানদণ্ড। আগের শিডিউলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে পাঁচ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং ট্রাক্টর-ট্রেইলার দিয়ে কনটেইনার পরিবহনে দুই বছরের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট বন্দর বা স্থানের বাধ্যবাধকতা ছিল না।

কিন্তু নতুন শিডিউলে বলা হয়েছে, দরদাতাকে বাংলাদেশের কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কমপক্ষে পাঁচ বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে গত ১০ বছরের মধ্যে সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহার করে অন্তত ৫০ কোটি টাকার একই ধরনের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো বন্দরে এই মাপের কাজ নিয়মিত না হওয়ায় কার্যত এই শর্ত পূরণ করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশে হাতে গোনা। এর মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থের মতো ব্যাপক আকারে খালি কনটেইনার স্থানান্তরের কাজ মূলত চট্টগ্রাম বন্দরে সীমাবদ্ধ। ফলে দেশের শত শত অফ-ডক, আইসিডি অপারেটর ও বেসরকারি লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান শুরুতেই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।

তাদের মতে, এটি এমন একটি ‘ক্যাচ-২২’ বা পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে আগে কাজ না করলে টেন্ডারে অংশ নেওয়া যাবে না, আবার টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলে সেই অভিজ্ঞতাও অর্জন করা সম্ভব নয়।

১ কোটি থেকে ১২ কোটি, নতুন করে ১০৫ কোটির শর্ত
নতুন দরপত্রে আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ডেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের শিডিউলে গড় বার্ষিক টার্নওভার ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। এবার তা বাড়িয়ে ১২ কোটি টাকা করা হয়েছে। একইভাবে এক কোটি টাকার লিকুইড অ্যাসেট বা ব্যাংক ক্রেডিট সুবিধার শর্ত বাড়িয়ে সাত কোটি টাকা করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, নতুন করে ‘ন্যূনতম সক্ষমতা’ ১০৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের কোনো শিডিউলে এমন শর্ত ছিল না।

প্রশ্ন তুলে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চার বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের চুক্তি হলেও কাজের মেয়াদ মাত্র এক বছর বেড়েছে। সেই তুলনায় আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ড ৭ থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর যৌক্তিকতা কী, তা দরপত্রে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

‘ব্র্যান্ড নিউ’ যন্ত্রপাতির বাধ্যবাধকতা
নতুন শিডিউলে বলা হয়েছে, দরদাতাকে নিজস্ব ব্র্যান্ড নিউ এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহার করতে হবে। শুধু তাই নয়, যন্ত্রপাতির উৎপাদনকাল দরপত্র প্রকাশের তারিখের এক বছরের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ নতুন ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা ৭০ শতাংশের নিচে নামলে নিজ খরচে তা প্রতিস্থাপন করার শর্তও।

আগের শিডিউলে ২০টি নিজস্ব এবং ১৫টি ভাড়ায় নেওয়া ট্রাক্টর-ট্রেইলার দেখানোর সুযোগ ছিল। ব্যবহৃত কিন্তু কার্যক্ষম যন্ত্রপাতি নিয়েও অংশগ্রহণে বাধা ছিল না।

অথচ বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ নিজেই বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগ থাকলেও নতুন আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের জন্য রাখা হয়েছে এই কড়া শর্ত।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ফ্লিট কেনা এবং টেন্ডার পাওয়ার আগেই এমন বিনিয়োগ করা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এই শর্তও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করার আরেকটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

জনবল কাঠামোতেও কড়াকড়ি
আগের টেন্ডারে শুধু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হতো। কিন্তু নতুন শিডিউলে অপারেশনাল প্রধান, টিম লিডার, ফাইন্যান্স ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার, অপারেশন ম্যানেজারসহ একাধিক পদে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া তিন শিফটে কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান, অন্তত ১২ জন দক্ষ ইকুইপমেন্ট অপারেটর এবং ৪০ জন দক্ষ ট্রাক্টর-ট্রেইলার চালক নিয়োগের শর্তও রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের বিস্তারিত জনবল কাঠামো সাধারণত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অপারেটরদের বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারণ করা হয়।

বন্দর মালিকদের সংগঠনের আপত্তি
এই বিতর্কিত শর্তাবলির কারণে বন্দরে মুক্ত প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিয়েছে বন্দর পরিচালনাকারী মালিকদের শীর্ষ সংগঠন ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই বিশেষ শর্তগুলো বহাল থাকলে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের আর কোনো যোগ্য দরদাতার অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না, এতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে কাজ পাওয়ার সুযোগ হারাবে এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা থাকলে যে অর্থ সাশ্রয় হতো তা থেকে বঞ্চিত হবে সরকার। চিঠিতে আরও বলা হয়, বারবার টেন্ডার ভেস্তে যাওয়ার সুযোগে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই বন্দরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে নতুন দরপত্রের বিতর্কিত শর্তগুলো বাতিল করে ২০১৩ ও ২০১৭ সালের মতো সহজ ও উন্মুক্ত শর্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে।

পিপিআর ভঙ্গের অভিযোগ
বার্থ অপারেটররা অভিযোগ করেছেন, দরপত্র দলিল ও প্রাক্কলন প্রণয়ন কমিটি পিপিআর বা সরকারি ক্রয় বিধিমালার মূলনীতি ভঙ্গ করেছে। বিশেষ করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত বিধি ৪ এবং যৌক্তিক যোগ্যতার মানদণ্ড সম্পর্কিত বিধি ৪৭ লঙ্ঘন করে শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতা ধ্বংস করে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃক গঠিত পাঁচ সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক বন্দরের সদস্য (অর্থ) মাহবুব আলম তালুকদার এবং এতে চুয়েটের একজন অধ্যাপক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধিসহ অন্য কর্মকর্তারা ছিলেন।

১৭ বছরের মামলা আর ডিপিএমের ইতিহাস
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে চার বছরের জন্য কাজটি পায় ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিএনপির বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন টেন্ডার ডাকা হলেও তা মামলা জটিলতায় আটকে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) আবারও এভারেস্টকেই দায়িত্ব দেয়।

২০২০ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর ২০২৩ সালে নতুন দরপত্রে এভারেস্ট ও তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেক অংশ নেয়। সেখানে সাইফ পাওয়ারটেক সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও পরবর্তী আইনি জটিলতায় সেই টেন্ডারও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আবারও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আগের প্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ কাজ চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বন্দর প্রতি বছর এভারেস্টকে পরিশোধ করছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, প্রতি ছয় মাসে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ফাঁকফোকর রাখা হয়, যাতে মামলা করে সহজেই পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করা সম্ভব হয়। আর প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ ধরে রাখে।

কাদের হাতে এই দুই প্রতিষ্ঠান
এই দুই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে, সেদিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য। সাবেক এই এলডিপি নেতা আওয়ামী লীগ আমলে তার ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডে’র মালিকানায় যুক্ত করেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা ও ফেনী-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন নাসিমকে। সমালোচনার মুখে পরে তারা সরে গেলেও পরে মালিকানায় ঢোকেন আলাউদ্দিন নাসিমের ভাই জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা ওয়াহিদ খান। তবে বুধবার (২৪ জুন) শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘এটা এখন শুধুই আমাদের পারিবারিক ব্যবসা।’

অন্যদিকে সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির তখনকার নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা আ জ নাছির উদ্দিন, সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী ও এমএ লতিফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বন্দরে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ সরকার বদল হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে, কিন্তু বন্দরের এই নির্দিষ্ট কাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ মূলত এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে সরেনি।

‘অলিখিত সমঝোতা’র অভিযোগ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকেই তরফদার রুহুল আমিন ও শাহাদাত হোসেন সেলিমের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা চলে আসছে। ফলে তরফদার কখনও সেলিমের পথের কাঁটা হয়ে ওঠেনি।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাবরই এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে লালনপালন করে গেছে। বন্দরের উর্ধতন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই তাদের সুবিধাভোগী।

বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, অবিলম্বে নতুন দরপত্রের বিতর্কিত শর্তগুলো বাতিল করে সহজ ও উন্মুক্ত শর্ত বহাল না রাখলে খালি কন্টেইনার স্থানান্তরের এই কাজের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

বন্দরের বার্থ অপারেটর এমএইচ চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খোন্দকার ফজলে আকবর মুরাদ বলেন, ‘এই টেন্ডার নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ বড় কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে। টেন্ডারটি কোন্ পত্রিকায় দিয়েছে, তা কেউ জানে না। মূলত দুটি কোম্পানিকে কাজটি পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্তগুলো বানানো হয়েছে, যার বেশিরভাগই অবাস্তব।’

তিনি বলেন, ‘যন্ত্রপাতির উৎপাদনকাল এক বছরের মধ্যে রাখার শর্ত কেন দেওয়া হলো, যখন বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিনের পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে? গত ১৭ বছরে একটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার জন্য বন্দর কি কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি বা উদ্যোগ নিয়েছে?’

শাহাদাত হোসেন সেলিমের আত্মপক্ষ
টেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘পিপিআরের (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা) সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে সিপিটিইউর (কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিট) নির্দেশনা মোতাবেক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।’

টেন্ডারটি নিয়ে ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র অভিযোগ নিয়ে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘এখানে এসোসিয়েশনের সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়নি। ব্যক্তিস্বার্থে এসোসিয়েশনের নাম ব্যবহার করে ওই অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’

সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্টকে সুবিধা দিতে দরপত্রটির শর্তগুলো তৈরি করা হয়েছে— ব্যবসায়ীদের এমন মন্তব্যের জবাবে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘কাকতালীয়ভাবে এটা মনে হতে পারে। তবে এই অভিযোগ সঠিক নয়। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।

অন্যদিকে সাইফ পাওয়ারটেকের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি অভিযোগগুলো সম্পর্কে নিরুত্তর থাকেন।

মুখে কুলুপ এঁটেছেন বন্দর কর্মকর্তারা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামানের কাছে টেন্ডারের কারসাজি নিয়ে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পরও তিনি এর কোনো জবাব দেননি।

পরিচালক (পরিবহন) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলায় নিষেধ আছে আমার। সুতরাং আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব হবে না।’ তিনি চিফ পার্সোনেল অফিসার নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে চিফ পার্সোনেল অফিসার বিষয়টি নিয়ে নিরবতার নীতি পালন করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

৫০ কোটির দেয়াল! চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডারে কার সুবিধা?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৩:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কন্টেইনার এক ইয়ার্ড থেকে অন্য ইয়ার্ডে স্থানান্তরের কাজটি দেখতে সাধারণ একটি সেবামূলক কার্যক্রম মনে হলেও শুধু এই কাজেই একটি প্রতিষ্ঠানের পকেটে ঢোকে বছরে ২০ কোটি টাকা। কাজটির নতুন দরপত্র ঘিরে এখন বন্দর অঙ্গনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। ১৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র প্রকাশ করে। গোপনে অচেনা পত্রিকায় প্রকাশিত সেই দরপত্রের শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে গত ১০ বছরের মধ্যে দেশের কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে অন্তত ৫০ কোটি টাকার একই ধরনের কাজ সফলভাবে শেষ করার প্রমাণ দিতে হবে, বার্ষিক টার্নওভার থাকতে হবে ন্যূনতম ১২ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে ১০৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশে কার্যত সচল সমুদ্রবন্দর দুটি—চট্টগ্রাম ও মোংলা।

মোংলায় এই মাত্রার অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার স্থানান্তরের কাজ নিয়মিত হয় না। ফলে এই একটি শর্তেই দেশের শত শত অভিজ্ঞ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ও আইসিডি (অফডক) অপারেটর শুরুতেই প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাচ্ছে, টিকে থাকে মূলত দুটি প্রতিষ্ঠান বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী তরফদার রুহুল আমীনের ‘সাইফ পাওয়ারটেক’। বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বদলে এমন কিছু নজিরবিহীন যোগ্যতা ও আর্থিক শর্ত দিয়ে দরপত্র সাজানো হয়েছে, যাতে আগে নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।

গোপনে অচেনা পত্রিকায় প্রকাশিত নতুন দরপত্রে উল্লেখিত শর্তাবলীর অংশবিশেষ। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বদলে এমন কিছু নজিরবিহীন যোগ্যতা ও আর্থিক শর্ত দিয়ে দরপত্র সাজানো হয়েছে, যাতে আগে নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।

৫০ কোটি টাকার অভিজ্ঞতার দেয়াল
নতুন দরপত্রের সবচেয়ে আলোচিত শর্ত হলো অভিজ্ঞতার মানদণ্ড। আগের শিডিউলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে পাঁচ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং ট্রাক্টর-ট্রেইলার দিয়ে কনটেইনার পরিবহনে দুই বছরের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট বন্দর বা স্থানের বাধ্যবাধকতা ছিল না।

কিন্তু নতুন শিডিউলে বলা হয়েছে, দরদাতাকে বাংলাদেশের কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কমপক্ষে পাঁচ বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে গত ১০ বছরের মধ্যে সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহার করে অন্তত ৫০ কোটি টাকার একই ধরনের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো বন্দরে এই মাপের কাজ নিয়মিত না হওয়ায় কার্যত এই শর্ত পূরণ করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশে হাতে গোনা। এর মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থের মতো ব্যাপক আকারে খালি কনটেইনার স্থানান্তরের কাজ মূলত চট্টগ্রাম বন্দরে সীমাবদ্ধ। ফলে দেশের শত শত অফ-ডক, আইসিডি অপারেটর ও বেসরকারি লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান শুরুতেই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।

তাদের মতে, এটি এমন একটি ‘ক্যাচ-২২’ বা পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে আগে কাজ না করলে টেন্ডারে অংশ নেওয়া যাবে না, আবার টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলে সেই অভিজ্ঞতাও অর্জন করা সম্ভব নয়।

১ কোটি থেকে ১২ কোটি, নতুন করে ১০৫ কোটির শর্ত
নতুন দরপত্রে আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ডেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের শিডিউলে গড় বার্ষিক টার্নওভার ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। এবার তা বাড়িয়ে ১২ কোটি টাকা করা হয়েছে। একইভাবে এক কোটি টাকার লিকুইড অ্যাসেট বা ব্যাংক ক্রেডিট সুবিধার শর্ত বাড়িয়ে সাত কোটি টাকা করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, নতুন করে ‘ন্যূনতম সক্ষমতা’ ১০৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের কোনো শিডিউলে এমন শর্ত ছিল না।

প্রশ্ন তুলে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চার বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের চুক্তি হলেও কাজের মেয়াদ মাত্র এক বছর বেড়েছে। সেই তুলনায় আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ড ৭ থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর যৌক্তিকতা কী, তা দরপত্রে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

‘ব্র্যান্ড নিউ’ যন্ত্রপাতির বাধ্যবাধকতা
নতুন শিডিউলে বলা হয়েছে, দরদাতাকে নিজস্ব ব্র্যান্ড নিউ এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার ব্যবহার করতে হবে। শুধু তাই নয়, যন্ত্রপাতির উৎপাদনকাল দরপত্র প্রকাশের তারিখের এক বছরের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ নতুন ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা ৭০ শতাংশের নিচে নামলে নিজ খরচে তা প্রতিস্থাপন করার শর্তও।

আগের শিডিউলে ২০টি নিজস্ব এবং ১৫টি ভাড়ায় নেওয়া ট্রাক্টর-ট্রেইলার দেখানোর সুযোগ ছিল। ব্যবহৃত কিন্তু কার্যক্ষম যন্ত্রপাতি নিয়েও অংশগ্রহণে বাধা ছিল না।

অথচ বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ নিজেই বছরের পর বছর মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগ থাকলেও নতুন আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের জন্য রাখা হয়েছে এই কড়া শর্ত।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ফ্লিট কেনা এবং টেন্ডার পাওয়ার আগেই এমন বিনিয়োগ করা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এই শর্তও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করার আরেকটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

জনবল কাঠামোতেও কড়াকড়ি
আগের টেন্ডারে শুধু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হতো। কিন্তু নতুন শিডিউলে অপারেশনাল প্রধান, টিম লিডার, ফাইন্যান্স ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার, অপারেশন ম্যানেজারসহ একাধিক পদে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া তিন শিফটে কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান, অন্তত ১২ জন দক্ষ ইকুইপমেন্ট অপারেটর এবং ৪০ জন দক্ষ ট্রাক্টর-ট্রেইলার চালক নিয়োগের শর্তও রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের বিস্তারিত জনবল কাঠামো সাধারণত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অপারেটরদের বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারণ করা হয়।

বন্দর মালিকদের সংগঠনের আপত্তি
এই বিতর্কিত শর্তাবলির কারণে বন্দরে মুক্ত প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিয়েছে বন্দর পরিচালনাকারী মালিকদের শীর্ষ সংগঠন ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই বিশেষ শর্তগুলো বহাল থাকলে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের আর কোনো যোগ্য দরদাতার অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না, এতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে কাজ পাওয়ার সুযোগ হারাবে এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা থাকলে যে অর্থ সাশ্রয় হতো তা থেকে বঞ্চিত হবে সরকার। চিঠিতে আরও বলা হয়, বারবার টেন্ডার ভেস্তে যাওয়ার সুযোগে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই বন্দরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে নতুন দরপত্রের বিতর্কিত শর্তগুলো বাতিল করে ২০১৩ ও ২০১৭ সালের মতো সহজ ও উন্মুক্ত শর্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে।

পিপিআর ভঙ্গের অভিযোগ
বার্থ অপারেটররা অভিযোগ করেছেন, দরপত্র দলিল ও প্রাক্কলন প্রণয়ন কমিটি পিপিআর বা সরকারি ক্রয় বিধিমালার মূলনীতি ভঙ্গ করেছে। বিশেষ করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত বিধি ৪ এবং যৌক্তিক যোগ্যতার মানদণ্ড সম্পর্কিত বিধি ৪৭ লঙ্ঘন করে শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতা ধ্বংস করে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃক গঠিত পাঁচ সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক বন্দরের সদস্য (অর্থ) মাহবুব আলম তালুকদার এবং এতে চুয়েটের একজন অধ্যাপক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধিসহ অন্য কর্মকর্তারা ছিলেন।

১৭ বছরের মামলা আর ডিপিএমের ইতিহাস
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে চার বছরের জন্য কাজটি পায় ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিএনপির বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন টেন্ডার ডাকা হলেও তা মামলা জটিলতায় আটকে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) আবারও এভারেস্টকেই দায়িত্ব দেয়।

২০২০ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর ২০২৩ সালে নতুন দরপত্রে এভারেস্ট ও তরফদার রুহুল আমীনের সাইফ পাওয়ারটেক অংশ নেয়। সেখানে সাইফ পাওয়ারটেক সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও পরবর্তী আইনি জটিলতায় সেই টেন্ডারও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আবারও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আগের প্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ কাজ চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বন্দর প্রতি বছর এভারেস্টকে পরিশোধ করছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, প্রতি ছয় মাসে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ফাঁকফোকর রাখা হয়, যাতে মামলা করে সহজেই পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করা সম্ভব হয়। আর প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ ধরে রাখে।

কাদের হাতে এই দুই প্রতিষ্ঠান
এই দুই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে, সেদিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য। সাবেক এই এলডিপি নেতা আওয়ামী লীগ আমলে তার ‘এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডে’র মালিকানায় যুক্ত করেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা ও ফেনী-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন নাসিমকে। সমালোচনার মুখে পরে তারা সরে গেলেও পরে মালিকানায় ঢোকেন আলাউদ্দিন নাসিমের ভাই জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা ওয়াহিদ খান। তবে বুধবার (২৪ জুন) শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘এটা এখন শুধুই আমাদের পারিবারিক ব্যবসা।’

অন্যদিকে সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির তখনকার নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা আ জ নাছির উদ্দিন, সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী ও এমএ লতিফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বন্দরে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ সরকার বদল হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে, কিন্তু বন্দরের এই নির্দিষ্ট কাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ মূলত এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে সরেনি।

‘অলিখিত সমঝোতা’র অভিযোগ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকেই তরফদার রুহুল আমিন ও শাহাদাত হোসেন সেলিমের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা চলে আসছে। ফলে তরফদার কখনও সেলিমের পথের কাঁটা হয়ে ওঠেনি।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাবরই এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে লালনপালন করে গেছে। বন্দরের উর্ধতন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই তাদের সুবিধাভোগী।

বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, অবিলম্বে নতুন দরপত্রের বিতর্কিত শর্তগুলো বাতিল করে সহজ ও উন্মুক্ত শর্ত বহাল না রাখলে খালি কন্টেইনার স্থানান্তরের এই কাজের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

বন্দরের বার্থ অপারেটর এমএইচ চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খোন্দকার ফজলে আকবর মুরাদ বলেন, ‘এই টেন্ডার নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ বড় কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে। টেন্ডারটি কোন্ পত্রিকায় দিয়েছে, তা কেউ জানে না। মূলত দুটি কোম্পানিকে কাজটি পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্তগুলো বানানো হয়েছে, যার বেশিরভাগই অবাস্তব।’

তিনি বলেন, ‘যন্ত্রপাতির উৎপাদনকাল এক বছরের মধ্যে রাখার শর্ত কেন দেওয়া হলো, যখন বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিনের পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে? গত ১৭ বছরে একটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার জন্য বন্দর কি কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি বা উদ্যোগ নিয়েছে?’

শাহাদাত হোসেন সেলিমের আত্মপক্ষ
টেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘পিপিআরের (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা) সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে সিপিটিইউর (কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিট) নির্দেশনা মোতাবেক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।’

টেন্ডারটি নিয়ে ‘বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র অভিযোগ নিয়ে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘এখানে এসোসিয়েশনের সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়নি। ব্যক্তিস্বার্থে এসোসিয়েশনের নাম ব্যবহার করে ওই অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’

সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্টকে সুবিধা দিতে দরপত্রটির শর্তগুলো তৈরি করা হয়েছে— ব্যবসায়ীদের এমন মন্তব্যের জবাবে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘কাকতালীয়ভাবে এটা মনে হতে পারে। তবে এই অভিযোগ সঠিক নয়। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।

অন্যদিকে সাইফ পাওয়ারটেকের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি অভিযোগগুলো সম্পর্কে নিরুত্তর থাকেন।

মুখে কুলুপ এঁটেছেন বন্দর কর্মকর্তারা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামানের কাছে টেন্ডারের কারসাজি নিয়ে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পরও তিনি এর কোনো জবাব দেননি।

পরিচালক (পরিবহন) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলায় নিষেধ আছে আমার। সুতরাং আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব হবে না।’ তিনি চিফ পার্সোনেল অফিসার নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে চিফ পার্সোনেল অফিসার বিষয়টি নিয়ে নিরবতার নীতি পালন করেন।