ঢাকা ১২:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ?

কুমিল্লা প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬ ৪২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। রাজধানী থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষ ও বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী যান চলাচল করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কে। বিশেষ করে কুমিল্লার অংশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ২০৬ কিলোমিটার মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫১০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে কুমিল্লার ১০৫ কিলোমিটার অংশে।

শুধু চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের ছুটিতেই চার দিনের ব্যবধানে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং ও কালাকচুয়া এলাকায় দুটি বড় দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এমন ঘটনা নতুন নয়; প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার খবর আসছে।

দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ

হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লা অংশে দুর্ঘটনার জন্য একক কোনো কারণ দায়ী নয়। বরং একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • মহাসড়কে থ্রিহুইলারের অবাধ চলাচল
  • অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত গতি
  • ফিটনেসবিহীন যানবাহন
  • অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক
  • ত্রুটিপূর্ণ ইউটার্ন
  • হঠাৎ রাস্তা পারাপার
  • ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করা
  • ট্রাফিক আইন অমান্য
  • মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতি
  • চালক ও পথচারীদের অসচেতনতা

পুলিশের মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ মানুষের অসতর্ক আচরণ এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা।

পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক

২০২৫ সালে কুমিল্লা রিজিয়নে ৫৯৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩৪১ জন এবং আহত হন ৬৪৮ জন।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৫৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন। আহত হয়েছেন আরও ৩৭৭ জন।

এ ধরনের পরিসংখ্যান দেখিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রতিবছর প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই প্রতিফলন।

কী বলছেন যাত্রী ও বিশেষজ্ঞরা?

যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, মহাসড়কে থ্রিহুইলারের দৌরাত্ম্য, বেপরোয়া বাস ও ট্রাক চালনা এবং অনিয়ন্ত্রিত পারাপার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—

  • সার্ভিস লেনসহ মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করা
  • ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন অপসারণ
  • অবৈধ থ্রিহুইলার নিয়ন্ত্রণ
  • নিরাপদ পথচারী পারাপার নিশ্চিত করা
  • আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা
  • ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে কুমিল্লা

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলেও কুমিল্লার অংশটি এখন দুর্ঘটনার হটস্পট হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ঈদযাত্রা কিংবা স্বাভাবিক সময়—প্রতিনিয়ত প্রাণহানি প্রমাণ করছে, অবকাঠামো উন্নয়ন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

নইলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক আরও অনেক পরিবারের জন্য আনন্দের যাত্রাকে শোকে পরিণত করতে থাকবে।

হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। রাজধানী থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষ ও বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী যান চলাচল করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কে। বিশেষ করে কুমিল্লার অংশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ২০৬ কিলোমিটার মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫১০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে কুমিল্লার ১০৫ কিলোমিটার অংশে।

শুধু চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের ছুটিতেই চার দিনের ব্যবধানে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং ও কালাকচুয়া এলাকায় দুটি বড় দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এমন ঘটনা নতুন নয়; প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার খবর আসছে।

দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ

হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লা অংশে দুর্ঘটনার জন্য একক কোনো কারণ দায়ী নয়। বরং একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • মহাসড়কে থ্রিহুইলারের অবাধ চলাচল
  • অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত গতি
  • ফিটনেসবিহীন যানবাহন
  • অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক
  • ত্রুটিপূর্ণ ইউটার্ন
  • হঠাৎ রাস্তা পারাপার
  • ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করা
  • ট্রাফিক আইন অমান্য
  • মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতি
  • চালক ও পথচারীদের অসচেতনতা

পুলিশের মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ মানুষের অসতর্ক আচরণ এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা।

পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক

২০২৫ সালে কুমিল্লা রিজিয়নে ৫৯৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩৪১ জন এবং আহত হন ৬৪৮ জন।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৫৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন। আহত হয়েছেন আরও ৩৭৭ জন।

এ ধরনের পরিসংখ্যান দেখিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রতিবছর প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই প্রতিফলন।

কী বলছেন যাত্রী ও বিশেষজ্ঞরা?

যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, মহাসড়কে থ্রিহুইলারের দৌরাত্ম্য, বেপরোয়া বাস ও ট্রাক চালনা এবং অনিয়ন্ত্রিত পারাপার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—

  • সার্ভিস লেনসহ মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করা
  • ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন অপসারণ
  • অবৈধ থ্রিহুইলার নিয়ন্ত্রণ
  • নিরাপদ পথচারী পারাপার নিশ্চিত করা
  • আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা
  • ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে কুমিল্লা

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলেও কুমিল্লার অংশটি এখন দুর্ঘটনার হটস্পট হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ঈদযাত্রা কিংবা স্বাভাবিক সময়—প্রতিনিয়ত প্রাণহানি প্রমাণ করছে, অবকাঠামো উন্নয়ন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

নইলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক আরও অনেক পরিবারের জন্য আনন্দের যাত্রাকে শোকে পরিণত করতে থাকবে।

হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।