ঝড়-বৃষ্টি ছাড়াই নেপালে মহাবিপর্যয়: হিমবাহ ধস থেকে কীভাবে নামল মৃত্যুর ঢল?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৯:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস বিশ্বকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাহাড়ি জনপদে নেমে আসে ধ্বংসের তাণ্ডব। প্রাণ হারিয়েছেন শত শত মানুষ, নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়—ঘটনার সময় এলাকায় ছিল না কোনো প্রবল বৃষ্টি, ছিল না কোনো সাধারণ বন্যার পূর্বাভাস। তাহলে কীভাবে হঠাৎ পাহাড় থেকে নেমে এলো এমন ভয়ংকর জল-কাদার স্রোত?
পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু ধ্বংসের যাত্রা
বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, এই বিপর্যয়ের শুরু হয়েছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে থাকা একটি বিশাল হিমবাহ থেকে।
স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করছেন, প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে হিমবাহের নিচের অংশ দুর্বল হয়ে হঠাৎ ভেঙে পড়ে। বিশাল বরফ, পাথর ও মাটির স্তূপ প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।
বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে বলছেন ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’—অর্থাৎ বরফ, পাথর ও পলিমাটির ভয়ংকর ধস।
এই ধসের কারণে লেন্দে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে যায়। পাহাড়ের মধ্যে তৈরি হয় অস্থায়ী জলাধার। পরে পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে সেই বাঁধ ভেঙে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে ভেসে আসে ভয়াবহ ঢল।
গবেষকদের মতে, ভোতেকোশি ও ত্রিশূলি নদীর পানির উচ্চতা অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ভূমিকম্প নয়, বরং ধস থেকেই সৃষ্টি কম্পন
ঘটনার পর প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে পাহাড় ধসে এই বিপর্যয় ঘটেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসও প্রথমে একটি ভূকম্পনের তথ্য দিয়েছিল।
তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভূমিকম্প নয়, বরং বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ পাহাড় থেকে আছড়ে পড়ার কারণেই ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল প্রকৃতির এমন এক আকস্মিক ঘটনা, যার জন্য প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সুযোগই পায়নি।
কেন এত প্রাণঘাতী হলো এই ঢল?
এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতার অন্যতম কারণ ছিল পানির সঙ্গে মিশে থাকা বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও বরফ।
স্বাভাবিক বন্যার পানির মতো ছিল না এই স্রোত। বরং এটি ছিল ঘন কাদামাটির এক ভয়ংকর প্রবাহ, যার গতি ও শক্তি ছিল প্রায় তরল কংক্রিটের মতো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঢলের সামনে দাঁড়িয়ে পালানোর সুযোগ প্রায় থাকে না। বিশেষ করে সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষ ও পর্যটকদের জন্য কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা?
গবেষকদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে গত কয়েক দশকে হিমালয়ের বহু হিমবাহ দ্রুত গলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফের নিচের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে, বাড়ছে হিমবাহ ধস, গ্লেসিয়াল লেক বিস্ফোরণ ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের মতো পাহাড়ি দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বাস্তব বিপদ।
আরও বিপদের আশঙ্কা
পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, ধসের পরও ঝুঁকি শেষ হয়নি। পাহাড়ি এলাকায় জমে থাকা মাটি ও পাথরের অস্থায়ী বাঁধ থেকে আবারও নতুন ঢলের আশঙ্কা রয়েছে।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়, বরং হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির একটি বড় সতর্কবার্তা। পৃথিবীর ‘ছাদ’ হিসেবে পরিচিত হিমালয় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে, আর তার প্রভাব পড়ছে পাহাড়ের মানুষ থেকে শুরু করে পুরো অঞ্চলের ওপর।






















