ঢাকা ১০:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যু: ক্ষতিপূরণ কেন নয়, হাইকোর্টের রুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৮:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না-কারণ দর্শাতে হাইকোর্টের রুল।

সারা দেশে হাম ও জলাতঙ্ক টিকার প্রাপ্যতা, পর্যাপ্ততা ও সরবরাহের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ৩০ দিনের মধ্যে হলফনামা আকারে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক কে নির্দেশ দিয়েছেন।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনে স্বাস্থ্য সচিবকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।

মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে ১০ মে হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করা হয়। সরকারের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আইইডিসিআর-এর পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে। 

আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব।  তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহামমদ শামীম আজিজ, ব্যারিস্টার মোঃ কাউছার, মোঃ মাকসুদুর রহমান, বায়েজিদ হোসাইন, লোকমান হাকিম এবং মারুফ হাসান তমাল।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল।

রিট আবেদনের ওপর গতকাল এবং মঙ্গলবার (১৯ মে) শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ উপরোক্ত আদেশ দেন। চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদেরকে রুলের  জবাব দিতে বলা হয়েছে। 

রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৫০০ অধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সারাদেশে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি ইতোমধ্যে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।  এই মৃত্যুগুলো আকস্মিক বা অনিবার্য ছিল না। বরং টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের কার্যকর ব্যবস্থার ব্যত্যয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা উপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাবের ফলেই এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ২০০৯-২০১৫ সালের মধ্যে হাম রুবেলা রোগ নির্মূলে বাংলাদেশের সফলতার জন্য দুইবার গ্যাভি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল।

রিট পিটিশনে বলা হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্তের পর দেশে হামের টিকার সরবরাহ ও টিকাদান কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ইউনিসেফ একাধিকবার সম্ভাব্য টিকা সংকট, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে সতর্ক করলেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। 

রিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আইসিইউ, পিআইসিইউ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে বহু শিশু সময়মতো চিকিৎসা পায়নি। অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেও শিশুদের জন্য আইসিইউ বা পিআইসিইউ বেড সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকাদান কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের  অবহেলাকে এই প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন।

এ প্রসঙ্গে রীট আবেদনকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের, বিশেষত শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এই রিটের উদ্দেশ্য কেবল ক্ষতিপূরণ প্রার্থনা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো নাগরিককে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুর শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করা। তিনি প্রত্যাশা করেন , দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধান এবং জনস্বার্থের অভিভাবক হিসেবে দেশের সকল শিশু এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে এই মামলার কাঙ্খিত রায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনায় ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং মৌলিক অধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক আইনগত ভিত্তি তৈরি করবে। 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যু: ক্ষতিপূরণ কেন নয়, হাইকোর্টের রুল

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৮:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না-কারণ দর্শাতে হাইকোর্টের রুল।

সারা দেশে হাম ও জলাতঙ্ক টিকার প্রাপ্যতা, পর্যাপ্ততা ও সরবরাহের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ৩০ দিনের মধ্যে হলফনামা আকারে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক কে নির্দেশ দিয়েছেন।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনে স্বাস্থ্য সচিবকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।

মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে ১০ মে হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করা হয়। সরকারের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আইইডিসিআর-এর পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে। 

আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব।  তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহামমদ শামীম আজিজ, ব্যারিস্টার মোঃ কাউছার, মোঃ মাকসুদুর রহমান, বায়েজিদ হোসাইন, লোকমান হাকিম এবং মারুফ হাসান তমাল।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল।

রিট আবেদনের ওপর গতকাল এবং মঙ্গলবার (১৯ মে) শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ উপরোক্ত আদেশ দেন। চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদেরকে রুলের  জবাব দিতে বলা হয়েছে। 

রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৫০০ অধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সারাদেশে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি ইতোমধ্যে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।  এই মৃত্যুগুলো আকস্মিক বা অনিবার্য ছিল না। বরং টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের কার্যকর ব্যবস্থার ব্যত্যয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা উপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাবের ফলেই এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ২০০৯-২০১৫ সালের মধ্যে হাম রুবেলা রোগ নির্মূলে বাংলাদেশের সফলতার জন্য দুইবার গ্যাভি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল।

রিট পিটিশনে বলা হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্তের পর দেশে হামের টিকার সরবরাহ ও টিকাদান কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ইউনিসেফ একাধিকবার সম্ভাব্য টিকা সংকট, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে সতর্ক করলেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। 

রিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আইসিইউ, পিআইসিইউ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে বহু শিশু সময়মতো চিকিৎসা পায়নি। অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেও শিশুদের জন্য আইসিইউ বা পিআইসিইউ বেড সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকাদান কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের  অবহেলাকে এই প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন।

এ প্রসঙ্গে রীট আবেদনকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের, বিশেষত শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এই রিটের উদ্দেশ্য কেবল ক্ষতিপূরণ প্রার্থনা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো নাগরিককে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুর শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করা। তিনি প্রত্যাশা করেন , দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধান এবং জনস্বার্থের অভিভাবক হিসেবে দেশের সকল শিশু এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে এই মামলার কাঙ্খিত রায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনায় ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং মৌলিক অধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক আইনগত ভিত্তি তৈরি করবে।