ঢাকা ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্ধ হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৩:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

মঙ্গলবার (১৯ মে) জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা বা পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ‘নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ’ সংক্রান্ত ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে’।

এরপর ২০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভ থেকে তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে রিট করা হয়।

এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালে জুডিসিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস করার আদেশ দেন। রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ রায় দেন।

রায়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের থাকবে; বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকবে না এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব বিচারক স্বাধীনভাবে কাজ করবেন; জুডিসিয়ারির (নিম্ন আদালত) বার্ষিক বাজেট প্রণয়নের ওপর নির্বাহী বিভাগের কোনো হাত থাকবে না। এই বাজেট সুপ্রিম কোর্ট প্রণয়ন এবং বরাদ্দ করবে।

আপিল বিভাগের ওই রায় ঘোষণার প্রায় ৮ বছর পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই ঘোষণা কাগজে কলমে রয়ে যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে এক অভিভাষণে বলেন, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের স্বার্থে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকরা বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন মর্মে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা ততদিন পর্যন্ত নিশ্চিত হবে না; যতদিন না বিচার বিভাগে দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজমান দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা, অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এরপর একই বছরের ২৭ অক্টোবর পৃথক সচিবালয়ের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠান।

পাশাপাশি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপারিশ করে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে ঘোষিত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের মূলনীতিকে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে অর্থবহ ও কার্যকররূপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে পৃথকীকরণের জন্য পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দেন।

এরপর সব কিছু পেছনে পেলে কাঙ্ক্ষিত ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথককরণের উদ্দেশ্যে স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বন্ধ হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৩:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

মঙ্গলবার (১৯ মে) জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা বা পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ‘নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ’ সংক্রান্ত ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে’।

এরপর ২০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভ থেকে তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে রিট করা হয়।

এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালে জুডিসিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস করার আদেশ দেন। রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ রায় দেন।

রায়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের থাকবে; বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকবে না এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব বিচারক স্বাধীনভাবে কাজ করবেন; জুডিসিয়ারির (নিম্ন আদালত) বার্ষিক বাজেট প্রণয়নের ওপর নির্বাহী বিভাগের কোনো হাত থাকবে না। এই বাজেট সুপ্রিম কোর্ট প্রণয়ন এবং বরাদ্দ করবে।

আপিল বিভাগের ওই রায় ঘোষণার প্রায় ৮ বছর পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই ঘোষণা কাগজে কলমে রয়ে যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে এক অভিভাষণে বলেন, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের স্বার্থে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকরা বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন মর্মে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা ততদিন পর্যন্ত নিশ্চিত হবে না; যতদিন না বিচার বিভাগে দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজমান দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা, অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এরপর একই বছরের ২৭ অক্টোবর পৃথক সচিবালয়ের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠান।

পাশাপাশি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপারিশ করে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে ঘোষিত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের মূলনীতিকে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে অর্থবহ ও কার্যকররূপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে পৃথকীকরণের জন্য পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দেন।

এরপর সব কিছু পেছনে পেলে কাঙ্ক্ষিত ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথককরণের উদ্দেশ্যে স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারি করা হয়।