বিচার বিভাগ ও ন্যায়পরায়ণতা প্রসঙ্গে
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:০৭:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ মে ২০২৫ ২৫২ বার পড়া হয়েছে
স্বাধীনতার অনতিকাল পরেই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রবর্তন করা হয়। সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুচ্ছেদের অন্যতম উদ্দেশ্য হল আইনের শাসন বা রুল অব ল সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
প্রতিটি স্বাধীন, সভ্য, আধুনিক দেশের ন্যায় আইনের শাসন সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশের সংবিধানের এই অন্যতম নীতি আইনের শাসন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ সকল দেশের সংবিধানে গৃহিত ও বহুল প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন মূলত আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল। আইন প্রণীত হয় জনগনের কল্যানের জন্য সমাজে ভারসাম্য আনয়নের জন্য। এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের মাধ্যমে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আইনের শাসনের প্রধান উদ্দেশ্যে হলো সমাজে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানুষের কল্যানের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সমাজ বিনির্মানে নিশ্চিত করা ও নিরাপদ ভূমিকা।
এ প্রসঙ্গে আইনের শাসন ধারনার অন্যতম প্রর্বতক ডাইসি বলেছেন যে আইনের শাসনে সমতা থাকা উচিত এবং কোনো ভেদাভেদ না করে সকলকে একই আইন ও আদালতের অধীনে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩১ অনুচ্ছেদে সমতার নীতির এক অসাধারণ বর্ননা আছে যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সংবিধানের তুলনায় অনেক অগ্রগামী। এটি অভিসংবাদিত যে আইনের শাসন গনতন্ত্রের অন্যতম উৎস ও অনিবার্য পূর্বশর্ত কিন্তু এই আইনের শাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই আইনের শাসন ও সুষ্টু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবে খুবই অপরিহার্য।
উপযুক্ত বিচারকের যোগ্যতা সর্ম্পকে কোন কোন আইন বিশেষজ্ঞ লেখকের অভিমত এই যে, “সকল বিচারকের আইন সম্পর্কিত ধারনা একরকম না থাকতে পারে। যদি কোনো বিচারক মনোজগতে এটি ধারনা করেন যে তার ধারনাটিই চূড়ান্ত তাহলে তার পক্ষে আইনজীবীদের উত্থাপিত যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলশ্রæতিতে বিচারকের সিদ্ধান্ত অজান্তেই বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই সঠিক ও দৃড় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং উদার ও ধৈর্যশীল মন নিয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শ্রবণ করাটা একজন বিচারকের সঠিক এবং প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে এর মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়টি। সেই সাথে আস্থা বাড়ে বিচারপ্রার্থী মানুষের।”
এই প্রসঙ্গে বোম্বে হাইকোর্ট এর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি চাগলার কথা উল্লেখ করে তাহার কথা এইভাবে বলা হয় যে “তার আইন বিষয়ে জ্ঞান ছিলো অপরিসীম, বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন প্রখর। সাধারণ জ্ঞান বা কমন সেন্স ছিলো তার। অতুলনীয়। আদালত কক্ষের ভিতরে বা বাইরে সর্বত্রই তার জ্ঞানের পরিচয় পরিলক্ষিত হতো বলে শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই হলো একজন বিচারকের শক্তি। আর এই শক্তিই বিচারক ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করে।
৬৯ ডিএলআর (এইচসি) ৩১৭ পৃষ্ঠায় একটি উল্লেখযোগ্য রায় প্রকাশিত হয়েছে। ঐখানে ৭টি মানদন্ডের এর কথা উল্লেখ করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল বিচারকের বয়স ৪৫ বৎসর হতে হবে এবং আপীল বিভাগে সনদ প্রাপ্তরা অগ্রাধিকার পাবে কিন্তু বাস্তবতা হল যারা হাইকোর্টে সনদ লাভের পর বাস্তবে জেলা আদালতে অনেক দিন প্রাকটিস করেন বা করেছেন এবং অনেক দিন বিদেশে অবস্থান করেন তাদের ক্ষেত্রেও বিচারক হিসাবে নিয়োগ পেতে বয়স নূন্যপক্ষে ৫০ বৎসর বয়স হওয়া দরকার। পেশাগত সফলতা ও অন্যান্য যোগ্যতা পর্যাপ্ত থাকার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফলাফলের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৬ এর উপধারা ২(ক) তে প্রার্থীর বয়স নূন্যতম ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) করা হয়েছে কিন্তু উর্ধ্বদিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই। বিগত বিচারক নিয়োগকালে বার এর সিনিয়র মেম্বারদের কম নিয়োগ করা হইয়াছে। সেক্ষেত্রে বিচারকর্ম বিভাগ থেকে দুইজন অবসরপ্রাপÍ বিচারককে (প্রায় ৬৫ বৎসর এর কাছাকাছি বয়সে) নিয়োগ করা হইয়াছে। সেই বিবেচনায় বার এর প্রবীণ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সদস্য এর নিয়োগ অগ্রাধিকারযোগ্য।
The Counsel Law Reports (SpL), 2017 , ২০১৭ (ষোলতম সংশোধনী মামলা) এর ৮০৭ নম্বর প্যারাগ্রাফে একজন প্রাক্তন মাননীয় প্রধান বিচারপতির রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন সে সময়ে “বিচারক নিয়োগে ভুলের কারণে মহাপ্রলয় ঘটেঠে”। তিনি বিচারব্যবস্থায় সেই সময়ের নিয়োগ নীতির সঠিক প্রয়োগ না করায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানদন্ডের প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই প্রকাশনার ৯০২ নম্বর প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি অন্যান্য বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার সহকর্মী বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সম্মিলিত মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। এই রীতিটি বিচার বিভাগের ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে সে ধারা প্রায় বিলুপ্ত; এই ধরনের মতবিনিময় বা পরামর্শের চর্চা এখন আর তেমনভাবে অনুসৃত হয় না, তবে প্রক্রিয়াটাও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে বিচারপতি নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে বিশেষভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। সাথে সাথে শপথ অনুসারে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই সকল পক্ষকে পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ দিয়ে ন্যায়ানুগ বিচার করা একজন বিচারকের পরম কর্তব্য। তাছাড়া একজন বিচারক কে ব্যক্তি জীবন সৎ, ন্যায়পরায়ণ আইনজ্ঞ ও জ্ঞানপিপাষু হওয়া বাঞ্চনীয়। সুপ্রীম কোর্ট বার থেকে এখনও বেশিরভাগ বিচারক নিয়োগ করা হয়। একজন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর প্রতিভা ও নিরপেক্ষতার মানদন্ড দেখে তাকে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। একজন নিরপেক্ষ ও প্রতিভাবান আইনজীবীর বিচারক হওয়া এবং ভালো গুণাবলীর অধিকারী হওয়া দরকার। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে প্রসঙ্গক্রমে একজন গুনী ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে তাকে উকিলের মতো জ্ঞানবক্তা এবং দরবেশের মতো দৃঢ়চিত্তের কথা উল্লেখ করেন। তাই বিচারক হওয়ার জন্য এই রকম আইনজীবী হওয়া প্রয়োজন। শুধু ভালো আইনজীবী হলে হবে না ভালো শিষ্টাচার (etiquette) এবং নৈতিকতার (morality) এবং নৈতিকতার (morality) অধিকারী হতে হবে। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৩ উপধারা ২ এর বিচারক নিয়োগ স্থায়ী কাউন্সিল বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন যে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ও সঠিক পদ্ধতি কোনোভাবে বিঘ্ন না হয় এবং বার ও বেঞ্চ এর ঐতিহ্যবাহী সু-সম্পর্ক বজায় থাকে।
বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৭(ক) তে উল্লেখিত রয়েছে “উহার বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় তথ্য নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করিতে পারিব; ইহা ছাড়াও ফরমে প্রার্থীদের নিকট হইতে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দরখাস্ত আহবান করিবে”।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো সমতার নীতি, বার ও বে একে অপরের সম্পূরক এবং পরিপূরক এ বিষয়ে ৩৫ ডিএলআর (এডি) ২৯০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, , “Both the bar and bench are two arms of the same machinery unless the work done harmoniously justice cannot be properly administered” এই জন্য বার ও বে’র সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে এবং সমৃদ্ধির জন্য সাম্য ও ন্যায় বিচার একান্ত দরকার। বিচারকার্যে ন্যায় বিচার এবং বিচার সম্পর্কিত অন্যান্য কার্য যেমন- আইনজীবীদের অধিকার, প্রিভিলেজ ও সকল ক্ষেত্রে সকলের জন্য সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের অনুসারে সমতা নীতির আলোকে অন্যান্য প্রাসাঙ্গিক বিচার বিশ্লেষণ করা বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে। অন্যথায় বার ও বে এর সুসম্পর্কর ঘাটতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়, বিধায় মাননীয় বিচারকবৃদ্ধের প্রতি নিবেদন বর্ণিত রায়, প্রতিষ্ঠিত আইন ও নীতির আলোকে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বিকাশে ও বির্নিমানে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারা উন্নয়নের জন্য সাম্য ও সমতার নীতি অনুসারে সামগ্রিকভাবে বর্ণিত সকল বিষয়সহ ন্যায় বিচারের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সাম্য নীতি অনুসরণ করা খুবই জরুরী অন্যথায় দেশে আইনের শাসন ও সমাজ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। আইন পেশায় সামন্তনীতি এবং রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি কবিতার মর্মানুসারে বৈষম্য ও গ্রাসনীতি কোনোভাবে কাম্য নয়। যাহা ভবিষ্যতে বিচ্ছেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার কারণ হয়ে দাড়ায়। বর্তমানে সিন্ডিকেট নামে একটি শব্দ খুবই বেশি হারে শুনা যায় যাহা ন্যাবিচার ও সমতা নীতিকে ব্যহত করে এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক হারে ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। এজন্য হযরত মোহাম্মদ (স:) একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে বরেছেন “তোমাদের পূর্বের কতক জাতিকে বিচার-ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল”। তাই আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্য ও সুষ্ঠু ন্যায়পরায়ণ বিচার ব্যবস্থা দরকার।
লেখক পরিচিতি: এম. কে. আহমদ পটল
বাংলাদেশ সুপ্রিম কার্টের একজন এডভোকেট।

















