ঢাকা ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্যানসার সৃষ্টিকারী আফলাটক্সিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:২৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভারত থেকে আসা চালের নমুনায় বিষাক্ত উপাদান শনাক্তের দাবি; প্রাথমিক পরীক্ষায় ‘খাওয়ার উপযোগী’ ছাড়পত্র, সরবরাহকারীর অস্বীকার—নমুনা পরীক্ষা ও মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সরকারি গুদামে থাকা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনা পরীক্ষায় এই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে পুরো চালানের অবশিষ্ট অংশ আরও পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে এই ঘটনায় তৈরি হয়েছে আরও বড় প্রশ্ন। বন্দরে চাল আসার পর প্রাথমিক পরীক্ষায় সেটিকে মানুষের খাওয়ার উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ছাড়পত্রের ভিত্তিতেই চাল খালাস করে সরকারি গুদামে পাঠানো হয়। পরে গুদামে মান নিয়ে আপত্তি ওঠে, আর নতুন পরীক্ষায় পাওয়া যায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অবশ্য এই ফলাফল মানতে নারাজ। তাদের দাবি, যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনার পরীক্ষায় চাল চুক্তির নির্ধারিত মান পূরণ করেছিল।

ফলে একই চালের নমুনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী পরীক্ষার ফল সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন, প্রথম পরীক্ষায় কীভাবে চাল খাওয়ার উপযোগী বিবেচিত হলো? নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না? আর যে চাল ইতিমধ্যে বিভিন্ন সরকারি গুদামে পৌঁছেছে, তার নিরাপত্তার দায় নেবে কে?

পরীক্ষায় আফলাটক্সিন, বন্ধ বিতরণ

গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোর (সিএসডি) চালের স্তূপ থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

এরপর ওই চালান থেকে গ্রহণ করা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করে খাদ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য কর্মকর্তারা চালের লট দুবার পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি ডিপো কর্তৃপক্ষকে বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি।

চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও চাল বিতরণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।


দীর্ঘদিন সংরক্ষণে তৈরি হতে পারে আফলাটক্সিন


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান জানান, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হলে চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। তবে পরীক্ষায় যে পরিমাণ উপাদান পাওয়া গেছে, তা সহনীয় মাত্রার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষ্য, আফলাটক্সিনের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

আফলাটক্সিন এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ, যা নির্দিষ্ট ছত্রাকের মাধ্যমে খাদ্যশস্যে তৈরি হতে পারে। খাদ্যশস্যের আর্দ্রতা ও সংরক্ষণ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ ধরনের দূষণের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে কোনো চালের নমুনায় এর উপস্থিতি পাওয়া গেলেই পুরো চালানকে একই মাত্রায় দূষিত বলা যায় না। ঝুঁকি নির্ধারণে নমুনায় এর সুনির্দিষ্ট মাত্রা, পরীক্ষাপদ্ধতি এবং প্রযোজ্য নিরাপদ সীমা জানা জরুরি।

এখানেই কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পরীক্ষায় ঠিক কত মাত্রার আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে? কোন মানদণ্ডে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে? আর সহনীয় সীমার মধ্যে থাকলে বিতরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী?

প্রথম পরীক্ষায় খাওয়ার উপযোগী, পরে আপত্তি

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল ওই চুক্তির অংশ হিসেবে চাল সরবরাহ করে।

চূড়ান্ত চালানের প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়।

প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চাল মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে জানানো হয়েছিল। এরপর ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। পরে চালগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানো হয়।

কিন্তু গুদামে পৌঁছানোর পর চালের মান নিয়ে আপত্তি ওঠে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ চালের মান অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করেন। এমনকি কিছু চাল খাওয়ার প্রায় অনুপযোগী বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

নিম্নমানের অভিযোগে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়। বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে নতুন করে মান পরীক্ষা করতে গিয়ে আফলাটক্সিনের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আসে।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে, বন্দরে নেওয়া প্রাথমিক নমুনা কি পুরো চালানের প্রকৃত মান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল? চালের বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, পরীক্ষার সময় সংরক্ষণজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

আফলাটক্সিন শনাক্তের দাবি অস্বীকার সরবরাহকারীর

চালে আফলাটক্সিন পাওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় চাল চুক্তির নির্ধারিত মান পূরণ করেছে বলে জানানো হয়।

ই-মেইলে প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করে, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা করা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলে তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে সংযুক্ত এসজিএস প্রতিবেদনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ পৃষ্ঠার উল্লেখ করেছে তারা।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চালের মান বজায় রাখতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালি অনুসরণ করেছে। চাল বিতরণ স্থগিতের আগে এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো অভিযোগও আসেনি।

অন্যদিকে, সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা দেশের জন্য সমস্যার কারণ হবে।

তবে সরবরাহকারীর দাবি কিংবা শিপিং এজেন্টের বক্তব্য—কোনোটিই পরীক্ষার ফলাফলের বিকল্প নয়। একইভাবে সরকারি পরীক্ষার ফলও স্বচ্ছ ও পুনরুৎপাদনযোগ্য পদ্ধতিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

পরীক্ষার ফল নিয়ে অস্পষ্টতা, জবাবদিহি কার?

একই চালের নমুনা নিয়ে একাধিক পরীক্ষায় ভিন্ন ফল আসার বিষয়টি পুরো আমদানি ও মান যাচাই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রথম পরীক্ষায় চাল খাওয়ার উপযোগী ঘোষণার পর গুদামে মান নিয়ে আপত্তি ওঠে। এরপর নতুন পরীক্ষায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতির কথা জানানো হয়। অথচ সরবরাহকারী বলছে, যৌথ নমুনার পরীক্ষায় এ ধরনের উপাদান পাওয়া যায়নি।

এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ জরুরি। কোন গুদাম থেকে কতটি নমুনা নেওয়া হয়েছে, নমুনা সংগ্রহের সময় চালের স্তূপের কোন কোন অংশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, কোন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট মাত্রা কত—এসব তথ্য জনসমক্ষে আসা দরকার।

এ ছাড়া ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বাইরে একই চালানের অন্য অংশ কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে, সেগুলোও নতুন করে পরীক্ষা করা হবে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে কোনো চাল বিতরণ হয়ে থাকলে তার পরিমাণ ও অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া জরুরি।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য আগে, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

সরকারি খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত চালের মান নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা শুধু আমদানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে সরকারি খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে এই চাল ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলে ঝুঁকি যাচাইয়ের দায়িত্ব আরও বেশি।

একদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, অন্যদিকে সরকারি পরীক্ষায় আফলাটক্সিন শনাক্তের তথ্য—দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ পুনঃপরীক্ষা। পরীক্ষার ফল, নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং চালের সুনির্দিষ্ট দূষণমাত্রা প্রকাশ না করলে সন্দেহ কাটবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্যানসার সৃষ্টিকারী আফলাটক্সিন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:২৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ভারত থেকে আসা চালের নমুনায় বিষাক্ত উপাদান শনাক্তের দাবি; প্রাথমিক পরীক্ষায় ‘খাওয়ার উপযোগী’ ছাড়পত্র, সরবরাহকারীর অস্বীকার—নমুনা পরীক্ষা ও মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সরকারি গুদামে থাকা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনা পরীক্ষায় এই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে পুরো চালানের অবশিষ্ট অংশ আরও পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে এই ঘটনায় তৈরি হয়েছে আরও বড় প্রশ্ন। বন্দরে চাল আসার পর প্রাথমিক পরীক্ষায় সেটিকে মানুষের খাওয়ার উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ছাড়পত্রের ভিত্তিতেই চাল খালাস করে সরকারি গুদামে পাঠানো হয়। পরে গুদামে মান নিয়ে আপত্তি ওঠে, আর নতুন পরীক্ষায় পাওয়া যায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অবশ্য এই ফলাফল মানতে নারাজ। তাদের দাবি, যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনার পরীক্ষায় চাল চুক্তির নির্ধারিত মান পূরণ করেছিল।

ফলে একই চালের নমুনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী পরীক্ষার ফল সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন, প্রথম পরীক্ষায় কীভাবে চাল খাওয়ার উপযোগী বিবেচিত হলো? নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না? আর যে চাল ইতিমধ্যে বিভিন্ন সরকারি গুদামে পৌঁছেছে, তার নিরাপত্তার দায় নেবে কে?

পরীক্ষায় আফলাটক্সিন, বন্ধ বিতরণ

গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোর (সিএসডি) চালের স্তূপ থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

এরপর ওই চালান থেকে গ্রহণ করা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করে খাদ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য কর্মকর্তারা চালের লট দুবার পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি ডিপো কর্তৃপক্ষকে বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি।

চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও চাল বিতরণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।


দীর্ঘদিন সংরক্ষণে তৈরি হতে পারে আফলাটক্সিন


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান জানান, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হলে চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। তবে পরীক্ষায় যে পরিমাণ উপাদান পাওয়া গেছে, তা সহনীয় মাত্রার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষ্য, আফলাটক্সিনের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

আফলাটক্সিন এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ, যা নির্দিষ্ট ছত্রাকের মাধ্যমে খাদ্যশস্যে তৈরি হতে পারে। খাদ্যশস্যের আর্দ্রতা ও সংরক্ষণ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ ধরনের দূষণের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে কোনো চালের নমুনায় এর উপস্থিতি পাওয়া গেলেই পুরো চালানকে একই মাত্রায় দূষিত বলা যায় না। ঝুঁকি নির্ধারণে নমুনায় এর সুনির্দিষ্ট মাত্রা, পরীক্ষাপদ্ধতি এবং প্রযোজ্য নিরাপদ সীমা জানা জরুরি।

এখানেই কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পরীক্ষায় ঠিক কত মাত্রার আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে? কোন মানদণ্ডে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে? আর সহনীয় সীমার মধ্যে থাকলে বিতরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী?

প্রথম পরীক্ষায় খাওয়ার উপযোগী, পরে আপত্তি

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল ওই চুক্তির অংশ হিসেবে চাল সরবরাহ করে।

চূড়ান্ত চালানের প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়।

প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চাল মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে জানানো হয়েছিল। এরপর ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। পরে চালগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানো হয়।

কিন্তু গুদামে পৌঁছানোর পর চালের মান নিয়ে আপত্তি ওঠে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ চালের মান অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করেন। এমনকি কিছু চাল খাওয়ার প্রায় অনুপযোগী বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

নিম্নমানের অভিযোগে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়। বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে নতুন করে মান পরীক্ষা করতে গিয়ে আফলাটক্সিনের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আসে।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে, বন্দরে নেওয়া প্রাথমিক নমুনা কি পুরো চালানের প্রকৃত মান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল? চালের বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, পরীক্ষার সময় সংরক্ষণজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

আফলাটক্সিন শনাক্তের দাবি অস্বীকার সরবরাহকারীর

চালে আফলাটক্সিন পাওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় চাল চুক্তির নির্ধারিত মান পূরণ করেছে বলে জানানো হয়।

ই-মেইলে প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করে, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা করা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলে তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে সংযুক্ত এসজিএস প্রতিবেদনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ পৃষ্ঠার উল্লেখ করেছে তারা।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চালের মান বজায় রাখতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালি অনুসরণ করেছে। চাল বিতরণ স্থগিতের আগে এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো অভিযোগও আসেনি।

অন্যদিকে, সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা দেশের জন্য সমস্যার কারণ হবে।

তবে সরবরাহকারীর দাবি কিংবা শিপিং এজেন্টের বক্তব্য—কোনোটিই পরীক্ষার ফলাফলের বিকল্প নয়। একইভাবে সরকারি পরীক্ষার ফলও স্বচ্ছ ও পুনরুৎপাদনযোগ্য পদ্ধতিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

পরীক্ষার ফল নিয়ে অস্পষ্টতা, জবাবদিহি কার?

একই চালের নমুনা নিয়ে একাধিক পরীক্ষায় ভিন্ন ফল আসার বিষয়টি পুরো আমদানি ও মান যাচাই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রথম পরীক্ষায় চাল খাওয়ার উপযোগী ঘোষণার পর গুদামে মান নিয়ে আপত্তি ওঠে। এরপর নতুন পরীক্ষায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতির কথা জানানো হয়। অথচ সরবরাহকারী বলছে, যৌথ নমুনার পরীক্ষায় এ ধরনের উপাদান পাওয়া যায়নি।

এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ জরুরি। কোন গুদাম থেকে কতটি নমুনা নেওয়া হয়েছে, নমুনা সংগ্রহের সময় চালের স্তূপের কোন কোন অংশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, কোন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট মাত্রা কত—এসব তথ্য জনসমক্ষে আসা দরকার।

এ ছাড়া ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বাইরে একই চালানের অন্য অংশ কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে, সেগুলোও নতুন করে পরীক্ষা করা হবে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে কোনো চাল বিতরণ হয়ে থাকলে তার পরিমাণ ও অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া জরুরি।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য আগে, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

সরকারি খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত চালের মান নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা শুধু আমদানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে সরকারি খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে এই চাল ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলে ঝুঁকি যাচাইয়ের দায়িত্ব আরও বেশি।

একদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, অন্যদিকে সরকারি পরীক্ষায় আফলাটক্সিন শনাক্তের তথ্য—দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ পুনঃপরীক্ষা। পরীক্ষার ফল, নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং চালের সুনির্দিষ্ট দূষণমাত্রা প্রকাশ না করলে সন্দেহ কাটবে না।