ছয় কোটি বাংলাদেশি দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০২:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
একসময় বাংলাদেশ ছিল দারিদ্র্য কমানোর সাফল্যের গল্প। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে কয়েক দশকে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে নিয়ে আসা হয়েছিল। ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘বিশ্বের মডেল’ বলেছিল বিশ্বব্যাংক। ২০৩১ সালের মধ্যে পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার আশাও দেখানো হয়েছিল।
কিন্তু সেই গল্পে এখন উল্টো মোড়।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র—গত চার বছরে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। শুধু গত এক বছরেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ।
আর সামনে রয়েছে আরও বড় ঝুঁকি। বর্তমানে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষও দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
প্রশ্নটা তাই শুধু কত মানুষ এখন দরিদ্র—তা নয়। প্রশ্ন হলো, দারিদ্র্য কমানোর যে ধারায় বাংলাদেশ এত দূর এগিয়েছিল, সেটি হঠাৎ উল্টো পথে গেল কেন?
যে জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল উল্টো যাত্রা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের চিত্র ছিল ভয়াবহ। সত্তরের দশকে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করতেন। এরপর সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি, কৃষির পরিবর্তন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তারে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
বিবিএসের হিসাবে, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অতি দারিদ্র্যের হারও দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশে।
তখন লক্ষ্য ছিল আরও সামনে যাওয়ার। কিন্তু এরপরই অর্থনীতির একাধিক স্তরে চাপ জমতে শুরু করে।
করোনা শুধু শুরুটা দেখিয়েছিল
করোনাভাইরাস মহামারির সময় অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। টিকে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানও কর্মী ছাঁটাই করে। এর ফলে আয় হারান বিপুলসংখ্যক মানুষ।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের ভাষ্য, করোনার পর অনেক মানুষ আর আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেননি। ফলে মহামারির ধাক্কা কেটে গেলেও তার প্রভাব অর্থনীতিতে থেকে যায়।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হয়নি।
বিনিয়োগ কোথায়?
করোনার পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে—এমন প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে সেই গতি দেখা যায়নি।
বিবিএসের হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। দুই বছর পর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতির গতি কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটি এখন কর্মসংস্থান নিয়েও—প্রবৃদ্ধি যদি কমে, নতুন কাজ কোথা থেকে আসবে?
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, করোনার পরও বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। তার দাবি, অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো ঘটনায় ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোও দুর্বল হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি যেন আরেক ধাক্কা
আয় কমেছে, কিন্তু ব্যয় থামেনি। বাংলাদেশে টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে যাদের আয় সীমিত, তাদের জন্য একই পরিমাণ অর্থে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একদিকে চাকরি হারানো বা আয় কমে যাওয়া, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম—এই দুই চাপ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবেই এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ।
মোট দারিদ্র্যের হারও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি।
ছয় কোটি ২০ লাখের ভয়টা এখানেই
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অবশ্য বর্তমান দরিদ্র মানুষের সংখ্যা নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকলেও যেকোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কায় তারা দারিদ্র্যের নিচে নেমে যেতে পারেন।
এর অর্থ, মূল্যস্ফীতি, চাকরি হারানো, অসুস্থতা, আয় কমে যাওয়া কিংবা নতুন কোনো অর্থনৈতিক সংকট—যেকোনো একটি ধাক্কাই বিপুলসংখ্যক পরিবারকে আবার দরিদ্র করে দিতে পারে। এটি শুধু দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান নয়; এটি মধ্যবিত্তের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন।
ভর্তুকির টাকা যাচ্ছে কোথায়?
আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি ব্যবস্থাকে ঘিরে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩৮ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন। আর সুবিধার পরিমাণেও রয়েছে বৈপরীত্য।
সমাজের নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাচ্ছেন। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে গড় সুবিধা ১০ হাজার ৪৭২ টাকা।
বিদ্যুৎ খাতেও একই প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের জন্যই বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হচ্ছে।
অর্থাৎ যে অর্থ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানোর কথা, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমন মানুষের কাছেও যাচ্ছে যারা তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।
ড. ফাহমিদা খাতুনের পরামর্শ—সবার জন্য ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে প্রকৃত দরিদ্রদের লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়া দরকার।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কতটা বদলাতে পারে চিত্র?
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলছেন, সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তার হিসাবে, বর্তমান ব্যবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত দরিদ্রদের শনাক্ত করে কার্ড দেওয়া গেলে সেই সংখ্যা বেড়ে হতে পারে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার।
অর্থাৎ শুধু টাকা খরচ করলেই হচ্ছে না—কার কাছে টাকা যাচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
কর আদায়েও দুর্বলতা
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছে। দুর্বল কর প্রশাসন ও করনীতি মেনে চলার হার কম থাকায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ সামান্য বেড়ে জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে আনুমানিক ৮ দশমিক ৩ শতাংশে উঠেছে।
কিন্তু বিপুল জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে সরকারের শক্তিশালী রাজস্বভিত্তি প্রয়োজন।
সেখানে রাজস্ব আহরণই যদি দুর্বল থাকে, তাহলে সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানোর সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
সরকারের ব্যাখ্যা: সংকটের অনেকটাই ‘উত্তরাধিকার’
সরকার অবশ্য বর্তমান সংকটের দায় পুরোপুরি নিজেদের বলে মানছে না। সরকারের বক্তব্য, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সমস্যা আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিও নতুন চাপ তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এসব সংকটের অনেকটাই বহিরাগত কারণ অথবা ‘উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত’।
তার দাবি, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কাজ করছে।
সামনে তাহলে কী?
পরিসংখ্যানের ভাষা কঠিন হলেও বাস্তবতার ছবিটি আরও কঠিন। একসময় যে বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছিল, সেই দেশেই এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আবার বাড়ছে। আরও বড় সংখ্যক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন দারিদ্র্যের ঝুঁকির কিনারায়।
৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ এখন দরিদ্র। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে।
এর মধ্যে বিনিয়োগ দুর্বল, কর্মসংস্থান সংকটে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ, রাজস্ব আহরণ সীমিত এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়। মূল প্রশ্ন হলো—অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই কত মানুষ আরও নিচে নেমে যাবেন, আর তাদের ঠেকানোর মতো নিরাপত্তাব্যবস্থা আদৌ কতটা প্রস্তুত?























