ঢাকা ১২:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুদেরও কি হার্ট অ্যাটাক হয়?

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বয়স মাত্র ১২ বছর। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সহপাঠীদের সঙ্গে স্কুলেই ছিল মেয়েটি। হঠাৎ বেঞ্চের ওপর বসে পড়ে যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি তাকে।

উত্তরপ্রদেশের কুশিনগরের এই ঘটনায় ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘হার্ট অ্যাটাক’। এত কম বয়সে এমন মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে—শিশুদেরও কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

উত্তর হলো, হ্যাঁ। তবে শিশুদের হার্ট অ্যাটাক অত্যন্ত বিরল। আর প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ধমনিতে দীর্ঘদিন ধরে চর্বি জমে যাওয়াই সাধারণত এর প্রধান কারণ নয়।

কীভাবে হয় হার্ট অ্যাটাক?

হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ঘটে যখন হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো অংশে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে করোনারি ধমনিতে কোলেস্টেরল ও চর্বি জমে প্লাক তৈরি হওয়া এবং পরে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধা অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু শিশুদের ধমনিতে বছরের পর বছর ধরে এভাবে প্লাক জমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তাই কোনো শিশুর গুরুতর কার্ডিয়াক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকেরা সাধারণত খোঁজেন জন্মগত হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, প্রদাহ, জিনগত রোগ কিংবা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত কারণ।

জন্মগত সমস্যাও হতে পারে কারণ

কিছু শিশুর জন্ম থেকেই করোনারি ধমনির গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। এই ধমনিগুলো হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে রক্ত পৌঁছে দেয়।

ধমনির গঠনে সমস্যা থাকলে রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদ্‌পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হৃদ্‌স্পন্দনে সমস্যা কিংবা আকস্মিক হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

ভাইরাসের পরও ঝুঁকি

শিশুদের হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো মায়োকার্ডাইটিস—অর্থাৎ হৃদ্‌পেশিতে প্রদাহ।

অনেক সময় বিভিন্ন সংক্রমণের পর এ ধরনের প্রদাহ দেখা দিতে পারে। এর সম্ভাব্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে—বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন, অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

গুরুতর অবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে পারে।

আরও যেসব কারণে বিপদ হতে পারে

শিশুদের কার্ডিয়াক ঝুঁকির পেছনে আরও কিছু বিরল কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

জিনগত হৃদ্‌স্পন্দনের সমস্যা, হৃদ্‌পেশির রোগ, কাওয়াসাকি ডিজিজ, রক্ত জমাট বাঁধার কিছু সমস্যা এবং বিরল গুরুতর কোলেস্টেরলজনিত অসুখ।

তবে কোনো শিশুর এসব উপসর্গ থাকলেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ একই ধরনের উপসর্গের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়

এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য। হার্ট অ্যাটাক হলো হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হৃদ্‌পেশির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা।

অন্যদিকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্‌যন্ত্র হঠাৎ কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়।

হার্ট অ্যাটাক থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হার্ট অ্যাটাক নয়।

তাই কোনো শিশু হঠাৎ পড়ে গেলে বা জ্ঞান হারালে শুধু ‘হার্ট অ্যাটাক’ ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। এর পেছনে অস্বাভাবিক হৃদ্‌স্পন্দন, জন্মগত হৃদ্‌রোগ কিংবা অন্য গুরুতর শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে।

কোন লক্ষণগুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না?

খেলাধুলা বা দৌড়ানোর সময় বারবার বুকে ব্যথা, কারণ ছাড়াই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, সামান্য পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, খুব দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে সাধারণ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

পরিবারে অল্প বয়সে বা কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই আকস্মিক মৃত্যুর ইতিহাস থাকলেও শিশুর হৃদ্‌যন্ত্রের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিরল হলেও সতর্কতা জরুরি

কুশিনগরের ১২ বছরের শিশুটির ঘটনা বিরল। কিন্তু এমন ঘটনা একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—শিশু হঠাৎ পড়ে গেলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

সব আকস্মিক অজ্ঞান হওয়া হার্ট অ্যাটাক নয়। তবে এর নেপথ্যে যদি গুরুতর কার্ডিয়াক সমস্যা থাকে, তাহলে দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করাই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

শিশুদেরও কি হার্ট অ্যাটাক হয়?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

বয়স মাত্র ১২ বছর। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সহপাঠীদের সঙ্গে স্কুলেই ছিল মেয়েটি। হঠাৎ বেঞ্চের ওপর বসে পড়ে যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি তাকে।

উত্তরপ্রদেশের কুশিনগরের এই ঘটনায় ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘হার্ট অ্যাটাক’। এত কম বয়সে এমন মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে—শিশুদেরও কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

উত্তর হলো, হ্যাঁ। তবে শিশুদের হার্ট অ্যাটাক অত্যন্ত বিরল। আর প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ধমনিতে দীর্ঘদিন ধরে চর্বি জমে যাওয়াই সাধারণত এর প্রধান কারণ নয়।

কীভাবে হয় হার্ট অ্যাটাক?

হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ঘটে যখন হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো অংশে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে করোনারি ধমনিতে কোলেস্টেরল ও চর্বি জমে প্লাক তৈরি হওয়া এবং পরে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধা অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু শিশুদের ধমনিতে বছরের পর বছর ধরে এভাবে প্লাক জমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তাই কোনো শিশুর গুরুতর কার্ডিয়াক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকেরা সাধারণত খোঁজেন জন্মগত হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, প্রদাহ, জিনগত রোগ কিংবা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত কারণ।

জন্মগত সমস্যাও হতে পারে কারণ

কিছু শিশুর জন্ম থেকেই করোনারি ধমনির গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। এই ধমনিগুলো হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে রক্ত পৌঁছে দেয়।

ধমনির গঠনে সমস্যা থাকলে রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদ্‌পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হৃদ্‌স্পন্দনে সমস্যা কিংবা আকস্মিক হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

ভাইরাসের পরও ঝুঁকি

শিশুদের হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো মায়োকার্ডাইটিস—অর্থাৎ হৃদ্‌পেশিতে প্রদাহ।

অনেক সময় বিভিন্ন সংক্রমণের পর এ ধরনের প্রদাহ দেখা দিতে পারে। এর সম্ভাব্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে—বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন, অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

গুরুতর অবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে পারে।

আরও যেসব কারণে বিপদ হতে পারে

শিশুদের কার্ডিয়াক ঝুঁকির পেছনে আরও কিছু বিরল কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

জিনগত হৃদ্‌স্পন্দনের সমস্যা, হৃদ্‌পেশির রোগ, কাওয়াসাকি ডিজিজ, রক্ত জমাট বাঁধার কিছু সমস্যা এবং বিরল গুরুতর কোলেস্টেরলজনিত অসুখ।

তবে কোনো শিশুর এসব উপসর্গ থাকলেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ একই ধরনের উপসর্গের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়

এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য। হার্ট অ্যাটাক হলো হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হৃদ্‌পেশির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা।

অন্যদিকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্‌যন্ত্র হঠাৎ কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়।

হার্ট অ্যাটাক থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হার্ট অ্যাটাক নয়।

তাই কোনো শিশু হঠাৎ পড়ে গেলে বা জ্ঞান হারালে শুধু ‘হার্ট অ্যাটাক’ ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। এর পেছনে অস্বাভাবিক হৃদ্‌স্পন্দন, জন্মগত হৃদ্‌রোগ কিংবা অন্য গুরুতর শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে।

কোন লক্ষণগুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না?

খেলাধুলা বা দৌড়ানোর সময় বারবার বুকে ব্যথা, কারণ ছাড়াই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, সামান্য পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, খুব দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে সাধারণ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

পরিবারে অল্প বয়সে বা কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই আকস্মিক মৃত্যুর ইতিহাস থাকলেও শিশুর হৃদ্‌যন্ত্রের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিরল হলেও সতর্কতা জরুরি

কুশিনগরের ১২ বছরের শিশুটির ঘটনা বিরল। কিন্তু এমন ঘটনা একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—শিশু হঠাৎ পড়ে গেলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

সব আকস্মিক অজ্ঞান হওয়া হার্ট অ্যাটাক নয়। তবে এর নেপথ্যে যদি গুরুতর কার্ডিয়াক সমস্যা থাকে, তাহলে দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করাই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।