ঢাকা ০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনায় বারবার আক্রমণ কেন? ঝিনাইদহে কী ঘটেছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা। শুধু এবারই নয়—গত দুই বছরের বেশি সময়ে ঝিনাইদহের এই ভাস্কর্যটি অন্তত চারবার ভাঙচুর বা অবমাননার শিকার হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার সকালে ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার ভাস্কর্যটিতে জুতার মালা পরানো অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দুপুরের দিকে ভাস্কর্য থেকে জুতার মালাটি সরিয়ে ফেলা হয়।

ঘটনার পর সেখানে যান জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে জরুরি বৈঠকও করেন জেলা প্রশাসক।

সিসিটিভিতে শনাক্ত, আটক একজন

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভাস্কর্যটির মাথায় জুতার মালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ভাস্কর্যের পাশেই থাকা সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—‘স্মৃতিস্তম্ভের মেরামত কাজ চলছে’।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আব্দুর রহমান সম্রাট নামে একজনকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করে পুলিশ।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না এবং কী উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তার ভাষ্য, আটক ব্যক্তি কেন এমন কাজ করেছেন, তা এখনো তদন্তাধীন। জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আটক ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তিনি ঝিনাইদহের বাসিন্দা।

দুই বছরেই চারবার

২০১৯ সালের মার্চে ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে এই চত্বরের উদ্বোধন করা হয়।

জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় থেকে ভাস্কর্যটি অন্তত চারবার ভাঙচুর বা প্রকাশ্যে অবমাননার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।

সবশেষ গত ১৩ জুলাই একটি চক্র ভাস্কর্যটি ভাঙচুর শুরু করলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। পরে জেলা প্রশাসন এ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার হামলা ও অবমাননার পরও ভাস্কর্যটি রক্ষায় কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংস্কারের উদ্যোগের কথা বলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলমান রয়েছে।

হামলার পেছনে কারা?

ঘটনাটির পেছনে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাত রয়েছে বলে মনে করেন ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ। তার দাবি, অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা একটি অসাধু চক্র এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

অন্যদিকে জেলা জামায়াতের আমীর ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর ঘটনাটিকে ‘কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতেই একটি গোষ্ঠী এ ধরনের কর্মকাণ্ড করছে।

তবে পুলিশ বলছে, ঘটনার উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে বড় প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনা, ভাস্কর্য, স্মৃতিফলক ও ম্যুরালে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতিফলক এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারকও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে।

এসব স্থাপনা কতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কিছু স্থাপনা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে কাজ এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ভাঙচুরের শিকার স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের সংস্কার কোথায়?

মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। ভাঙচুরের দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বুধবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে সংস্কারকাজ শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যমকর্মী।

এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভাস্কর্য ধ্বংস করা হলেও এসব ঘটনায় কার্যকর প্রতিকার দেখা যায়নি।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স সংস্কারে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের আলোর সরকার।’

ফলে ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যে নতুন করে অবমাননার ঘটনা শুধু একজনকে আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—বারবার হামলার পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে?

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনায় বারবার আক্রমণ কেন? ঝিনাইদহে কী ঘটেছে?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা। শুধু এবারই নয়—গত দুই বছরের বেশি সময়ে ঝিনাইদহের এই ভাস্কর্যটি অন্তত চারবার ভাঙচুর বা অবমাননার শিকার হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার সকালে ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার ভাস্কর্যটিতে জুতার মালা পরানো অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দুপুরের দিকে ভাস্কর্য থেকে জুতার মালাটি সরিয়ে ফেলা হয়।

ঘটনার পর সেখানে যান জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে জরুরি বৈঠকও করেন জেলা প্রশাসক।

সিসিটিভিতে শনাক্ত, আটক একজন

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভাস্কর্যটির মাথায় জুতার মালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ভাস্কর্যের পাশেই থাকা সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—‘স্মৃতিস্তম্ভের মেরামত কাজ চলছে’।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আব্দুর রহমান সম্রাট নামে একজনকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করে পুলিশ।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না এবং কী উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তার ভাষ্য, আটক ব্যক্তি কেন এমন কাজ করেছেন, তা এখনো তদন্তাধীন। জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আটক ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তিনি ঝিনাইদহের বাসিন্দা।

দুই বছরেই চারবার

২০১৯ সালের মার্চে ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে এই চত্বরের উদ্বোধন করা হয়।

জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় থেকে ভাস্কর্যটি অন্তত চারবার ভাঙচুর বা প্রকাশ্যে অবমাননার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।

সবশেষ গত ১৩ জুলাই একটি চক্র ভাস্কর্যটি ভাঙচুর শুরু করলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। পরে জেলা প্রশাসন এ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার হামলা ও অবমাননার পরও ভাস্কর্যটি রক্ষায় কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংস্কারের উদ্যোগের কথা বলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলমান রয়েছে।

হামলার পেছনে কারা?

ঘটনাটির পেছনে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাত রয়েছে বলে মনে করেন ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ। তার দাবি, অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা একটি অসাধু চক্র এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

অন্যদিকে জেলা জামায়াতের আমীর ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর ঘটনাটিকে ‘কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতেই একটি গোষ্ঠী এ ধরনের কর্মকাণ্ড করছে।

তবে পুলিশ বলছে, ঘটনার উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে বড় প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনা, ভাস্কর্য, স্মৃতিফলক ও ম্যুরালে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতিফলক এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারকও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে।

এসব স্থাপনা কতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কিছু স্থাপনা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে কাজ এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ভাঙচুরের শিকার স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের সংস্কার কোথায়?

মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। ভাঙচুরের দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বুধবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে সংস্কারকাজ শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যমকর্মী।

এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভাস্কর্য ধ্বংস করা হলেও এসব ঘটনায় কার্যকর প্রতিকার দেখা যায়নি।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স সংস্কারে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের আলোর সরকার।’

ফলে ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যে নতুন করে অবমাননার ঘটনা শুধু একজনকে আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—বারবার হামলার পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে?