শেখ সেলিমকে নেতৃত্বে আনার ইস্যুতে আওয়ামী লীগে নতুন অস্বস্তি?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৫৭:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা অনুপস্থিত থাকলে দলের দায়িত্ব কে পালন করবেন—এ নিয়ে তার সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর দলটির ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম সামনে আসায় দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও নেতৃত্ব নিয়ে অস্বস্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম দায়িত্ব পালন করতে পারেন—এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
তবে আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ কেউ দলের ভেতরে নেতৃত্ব সংকট বা বিরোধের খবর নাকচ করেছেন। কলকাতায় অবস্থানরত দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এএফএম বাহাউদ্দিন নাছিম এমন তথ্য প্রত্যাখ্যান করলেও এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার কাছে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
যুক্তরাজ্যে থেকে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা সাবেক সংসদ সদস্য মো. হাবিবে মিল্লাত বলেন, শেখ হাসিনাই দলের সভাপতি এবং তিনি দেশে ফেরার কথা বলেছেন। তার ভাষ্য, অন্য কাউকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে দলীয় পরিমণ্ডলে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানেন না।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাতও নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সংকট বা দ্বন্দ্বের কথা অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, দলের গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সভানেত্রী আছেন এবং থাকবেন। কোনো পরিবর্তন বা নতুন সিদ্ধান্ত হলে তার একমাত্র ফোরাম দলের কাউন্সিল। ফলে বর্তমানে নেতৃত্ব নিয়ে যে প্রচারণা চলছে, তা গুজব।
শেখ সেলিমকে ঘিরে কেন অসন্তোষ?
তবে কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্রের আভাস পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, শেখ হাসিনা সরাসরি শেখ সেলিমকে ভবিষ্যৎ সভাপতি করার কথা না বললেও সম্প্রতি তাকে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় করা নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। শুরুতে তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ খুব একটা ছিল না। পরে শেখ হাসিনার তৎপরতায় কলকাতায় থাকা দলের একটি অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে।
পূর্ব কলকাতার টেংরা এলাকায় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বাসায় নিয়মিত দলীয় বৈঠকও হতে থাকে। এসব বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এএফএম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ কলকাতায় সক্রিয় নেতারা অংশ নিতেন। কখনো কখনো ভার্চুয়াল মাধ্যমে শেখ হাসিনাও এসব বৈঠকে যুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সভাপতিমণ্ডলীর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কলকাতার নিউটাউন এলাকায় অবস্থান করলেও দীর্ঘদিন দলীয় এসব কর্মকাণ্ডে তাকে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি।
এমনকি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কলকাতায় যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দলীয় কোনো বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি। পরে ভার্চুয়াল সভাগুলোতে শেখ হাসিনার উদ্যোগে তিনি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি শেখ সেলিমকে দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কয়েকটি বৈঠকে সভাপতিত্বও করেছেন তিনি। বয়স ও জ্যেষ্ঠতার কারণে এসব বৈঠকের কিছু তার নিউটাউনের বাসায় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই পরিবর্তন নিয়েই দলের একটি অংশে অসন্তোষ রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শেখ সেলিম প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে থাকলেও দলের কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন না। দল ক্ষমতায় থাকার সময়ও দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা কম ছিল। এ ছাড়া তার কয়েকজন আত্মীয় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় থাকায় তাকে ঘিরে দলের একটি অংশের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
‘গঠনতন্ত্রের বাইরে কিছু হয় না’
তবে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিষয়টিকে নেতৃত্বের সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, শেখ হাসিনা মূলত দলের গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথাই বলেছেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন না—এমন কয়েকটি বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে শেখ সেলিম সভাপতিত্ব করেছেন। এর বাইরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের কোনো বিষয় নেই।
তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা সভানেত্রী আছেন এবং থাকবেন।
নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগের পুরোনো ইতিহাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদের মতে, আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতেও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের জেরে দল ভাগ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নজির রয়েছে।
তার মতে, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক না হলে এবং দল গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে নিতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব সংকট তৈরির আশঙ্কা থেকেই যায়।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। পরে নেতৃত্বের বিরোধের জেরে ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (মিজান) ও আওয়ামী লীগ (মালেক) নামে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি।
পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তখন তিনি দেশের বাইরে নির্বাসনে ছিলেন। দল পুনর্গঠনের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তাকে নেতৃত্বে আনা হয়।
দেশে ফেরার পরও দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। দলের অন্যতম নেতা আব্দুর রাজ্জাক তখন আলাদা রাজনৈতিক দল বাকশাল সক্রিয় রেখেছিলেন। পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে বাকশাল বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন তিনি।
এরপর ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে দলটির ভেতরে সংস্কার ইস্যুতে আবারও নেতৃত্বের বিরোধ সামনে আসে। শেখ হাসিনা কারাগারে থাকা অবস্থায় কয়েকজন সিনিয়র নেতা সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং দলে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়।
২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ওই সিনিয়র নেতাদের অনেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। এরপর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে শেখ হাসিনার একক কর্তৃত্বই ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
সামনে কি নতুন সমীকরণ?
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও দলের ভেতর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠেনি। তবে এবার তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গে শেখ সেলিমের নাম সামনে আসায় দলটির ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একদিকে দলীয় মুখপাত্ররা নেতৃত্ব সংকটের কথা অস্বীকার করছেন, অন্যদিকে দলের একটি অংশ শেখ সেলিমের সাম্প্রতিক সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এ নিয়ে ভবিষ্যতে দলের ভেতরে কোনো নতুন সমীকরণ তৈরি হয় কি না—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।


























